উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থের অপচয় রোধে প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি আরোপ করেছে সরকার। এখন থেকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব দিলেই মিলবে না প্রকল্পের অনুমোদন। বিনিয়োগের বিপরীতে কতটা আর্থিক সুফল আসবে, কত মানুষের কর্মসংস্থান হবে, পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়বে এবং প্রকল্পটি দীর্ঘ মেয়াদে কতটা কার্যকর থাকবে—এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে হবে প্রকল্প প্রস্তাবে। এ লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান বাড়ানো, ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিশ্চিত এবং বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় ১৩টি নির্দেশনা জারি করেছে পরিকল্পনা বিভাগ। সম্প্রতি জারি করা নির্দেশনায় প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদনের প্রচলিত প্রক্রিয়ায় সুফলভিত্তিক মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির সময় ভ্যালু ফর মানি বা অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে বলা হয়েছে।
- ডিপিপিতে আর্থিক রিটার্ন, কর্মসংস্থান ও পরিবেশগত প্রভাবের বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ
- গুরুত্ব পাবে প্রযুক্তি হস্তান্তর, জলবায়ু সহনশীলতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি
- ঋণের বোঝা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প অনুমোদনের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
প্রকল্পের আগে দিতে হবে সুফলের হিসাব
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে প্রকল্প গ্রহণের আগে এর প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্যতা, আর্থিক রিটার্ন ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা যাচাইয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলোও প্রকল্প মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি প্রকল্পের ডিপিপিতে বিনিয়োগের বিপরীতে সম্ভাব্য আর্থিক রিটার্ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। প্রকল্পের মানদণ্ড, বাস্তবায়নযোগ্যতা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তও সংযুক্ত করতে হবে। শুধু বরাদ্দের পরিমাণ নয়, সেই অর্থ কীভাবে সর্বোচ্চ জনস্বার্থে কাজে লাগবে, সেটিও তুলে ধরতে হবে।
পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষায় বাড়তি গুরুত্ব
পরিবেশগত দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও থাকছে বাড়তি নজরদারি। প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশের সম্ভাব্য ক্ষতি চিহ্নিত করার পাশাপাশি তা কমানোর পরিকল্পনা ডিপিপিতে রাখতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ সুরক্ষা ও কার্বন ক্রেডিট-সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) প্রতিবেদন তৈরি ও জমা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো বাধ্যতামূলক
সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতেও নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের অবকাঠামো যেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহারের উপযোগী হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী র্যাম্প, লিফট, প্রতিবন্ধীবান্ধব শৌচাগারসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা রাখার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া নতুন অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ও পরিকল্পনাধীন অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনে কী ধরনের অবদান রাখা সম্ভব, তাও ডিপিপিতে উল্লেখ করতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা ও আগাম ঝুঁকি মোকাবিলার পরিকল্পনা রাখার নির্দেশনাও দিয়েছে পরিকল্পনা বিভাগ।
ঋণের বোঝা কমাতে সতর্কতার তাগিদ
সংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে বড় অংশই আসে সরকারি ঋণ থেকে। ফলে প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত না হলে তার আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়ে। এ কারণে প্রকল্প অনুমোদনের আগেই ব্যয় ও প্রাপ্তির হিসাব কঠোরভাবে যাচাই করা জরুরি।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। কারণ, এসব প্রকল্পের অর্থায়নে বড় একটি অংশই আসে ঋণ থেকে, যা শেষ পর্যন্ত জনগণকে পরিশোধ করতে হয়। তাই প্রকল্প অনুমোদনের আগে সম্ভাব্য সুফল, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত আর্থিক রিটার্ন যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) তিন লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে সরকার। অবকাঠামো উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন ত্বরান্বিত করাই এ বরাদ্দের লক্ষ্য।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নতুন নির্দেশনা কার্যকর হলে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও অপর্যাপ্ত পরিকল্পনার সুযোগ কমবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থনৈতিক উপযোগিতা, সামাজিক প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল যাচাইয়ের সুযোগ বাড়বে। তবে নির্দেশনাগুলো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকল্প যাচাই ও অনুমোদনের প্রতিটি পর্যায়ে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে প্রত্যাশিত ফল।
সন্ধানী বার্তা/আরআই/এমকে