বিনোদন

প্রেম-বিয়ে-মামলা, বিতর্কের একের পর এক অধ্যায়ে পরীমনি

ঢালিউডের আলোচিত নায়িকাদের তালিকায় পরীমনির নাম বরাবরই সামনের দিকে। সিনেমার পর্দায় অভিনয় দিয়ে যেমন দর্শকের নজর কেড়েছেন, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা, আইনি জটিলতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট তাঁকে বারবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। কখনো বোট ক্লাবের ঘটনা, কখনো মাদক মামলা, আবার কখনো প্রেম, বিয়ে ও বিচ্ছেদ—বিভিন্ন সময়ে নানা ঘটনায় সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন এই অভিনেত্রী। পিরোজপুরের এক সাধারণ মেয়ের চলচ্চিত্রে পথচলা থেকে শুরু করে তারকাখ্যাতি, এরপর একের পর এক বিতর্ক—পরীমনির জীবন যেন আলো-আঁধারির এক দীর্ঘ গল্প।

পিরোজপুর থেকে ঢালিউডের রুপালি পর্দায়

​
পিরোজপুরে জন্ম নেওয়া পরীমনি ছোটবেলাতেই মা-বাবাকে হারান। এরপর নানাবাড়িতে বেড়ে ওঠেন তিনি। মডেলিংয়ের মাধ্যমে বিনোদনজগতে যাত্রা শুরু হলেও তাঁর স্বপ্ন ছিল বড় পর্দায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।

২০১৫ সালে শাহ আলম মণ্ডল পরিচালিত ‘ভালোবাসা সীমাহীন’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তাঁর। তবে প্রথম সিনেমা মুক্তির আগেই প্রায় দুই ডজন ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। অল্প সময়ের মধ্যেই ঢালিউডে নিজের অবস্থান তৈরি করেন এই অভিনেত্রী।

ক্যারিয়ারে প্রায় ৩০টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন পরীমনি। ‘স্বপ্নজাল’, ‘বিশ্বসুন্দরী’, ‘রক্ত’ ও ‘গুণিন’-এর মতো সিনেমায় তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে। তবে অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবন ঘিরেও তাঁকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি।

বোট ক্লাবের ঘটনা ও আইনি জটিলতা

​
২০২১ সালের জুনে সাভারের একটি বোট ক্লাবে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলে ফেসবুক লাইভে আসেন পরীমনি। লাইভে কান্নায় ভেঙে পড়ে ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি। এ ঘটনায় ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে ওই ক্লাবে ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগেও পরীমনির বিরুদ্ধে মামলা হয়।

এই মামলাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে আইনি প্রক্রিয়া চলেছে। চলতি বছরের ৫ নভেম্বর ঢাকার আদালতে আত্মসমর্পণ ও জামিন পাওয়ার ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় আসে। একই ঘটনাকে ঘিরে আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর আচরণ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

মাদক মামলা ও কারাবাস

​
বোট ক্লাবের ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন আইনি জটিলতায় পড়েন পরীমনি। ২০২১ সালের ৪ আগস্ট বনানীর বাসায় অভিযান চালায় র‍্যাব। অভিযানে মদ ও মাদকদ্রব্য উদ্ধারের অভিযোগে তাঁকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়।

মামলার পর প্রায় এক মাস কারাগারে থাকতে হয় এই অভিনেত্রীকে। পরে জামিনে মুক্তি পান তিনি। কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর হাতে মেহেদি দিয়ে লেখা ‘ডোন্ট লাভ মি বিচ’ বাক্যটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তী সময়ে আদালতে হাজিরার সময় হাতের তালুতে লেখা আরেকটি আপত্তিকর বার্তাও সমালোচনার কারণ হয়।

ডিবি কর্মকর্তা সাকলায়েনকে ঘিরে বিতর্ক

​
কারাগার থেকে মুক্তির পর পরীমনিকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন কর্মকর্তা গোলাম সাকলায়েনকে নিয়ে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁদের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি সামনে আসে। সাকলায়েনের সরকারি বাসভবনে পরীমনির অবস্থান এবং জন্মদিন উদ্‌যাপনের কিছু ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।

এ ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনেও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে গোলাম সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। ঘটনাটি পরীমনির ব্যক্তিগত জীবনকে ঘিরে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

প্রেম, বিয়ে ও বিচ্ছেদের গল্প

​
পরীমনির ব্যক্তিগত জীবনও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমের আলোচনার বিষয় হয়েছে। তাঁর আগের বিয়ে নিয়ে ছবি ও কাবিননামা প্রকাশের পর নানা আলোচনা তৈরি হয়। ২০২০ সালে তিন টাকা দেনমোহরে বিয়ের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

পরে অভিনেতা শরিফুল রাজের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান পরীমনি। তাঁদের বিয়ে ও সন্তান জন্মের খবর একসময় ভক্তদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। কিন্তু সেই সংসারও শেষ পর্যন্ত টেকেনি। দুজনের সম্পর্কের অবনতি, বিচ্ছেদ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নিয়ে তৈরি হয় নানা আলোচনা।
বিশেষ করে শরিফুল রাজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে কয়েকজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত ভিডিও প্রকাশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে। একসময় যে সম্পর্ক নিয়ে ভক্তদের আগ্রহ ছিল, পরে সেটিই পরিণত হয় প্রকাশ্য বিরোধ ও বিতর্কের বিষয়ে।

আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকের সঙ্গে বিতর্ক

​
পরীমনিকে ঘিরে সর্বশেষ আলোচনার সূত্রপাত ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে। ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মামলায় জামিন পাওয়ার পর এক সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁর বাগ্‌বিতণ্ডা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই সাংবাদিককে গালিগালাজ ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। পাশাপাশি পরীমনির দেহরক্ষীদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হাহা, ফুস!’ লিখে একটি পোস্ট দেন পরীমনি। পোস্টটি ঘিরেও শুরু হয় নতুন আলোচনা ও সমালোচনা। এরপর তাঁর আরও কিছু ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

আলোচনা-সমালোচনার মাঝেও নিজের জায়গায় পরীমনি

​
চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর অল্প সময়েই পরিচিতি পেয়েছিলেন পরীমনি। অভিনয়, সৌন্দর্য ও পর্দার উপস্থিতি তাঁকে দর্শকের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও আইনি ঘটনাগুলোও বারবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

একদিকে চলচ্চিত্রে কাজ, অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা—দুইয়ের টানাপোড়েনে পরীমনিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক পরিচিতি। তাঁকে নিয়ে প্রশংসা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে সমালোচনাও। তবে বিতর্কের বাইরে একজন অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর কাজ ও চলচ্চিত্রে অবদান নিয়েও আলোচনা হওয়া জরুরি।

সন্ধানী বার্তা/এসএ/জেএন 


সম্পর্কিত খবর