মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে পরিচিত রিপাবলিকানদের দুর্গেও এবার বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে কট্টর রিপাবলিকান সমর্থকদের আধিপত্য থাকা অঙ্গরাজ্যগুলোতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের অভাবনীয় সাফল্য ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যে ভোটব্যাংকের ওপর ভর করে তিনি একাধিকবার হোয়াইট হাউসে পৌঁছেছিলেন, সেই সমর্থকদের একটি বড় অংশ এবার তাঁর দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ট্রাম্পের একচ্ছত্র প্রভাব কমতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় কেবল কংগ্রেসের আসনসংখ্যার হিসাব পাল্টে দেয়নি, বরং ট্রাম্প প্রশাসনের গত দুই বছরের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতির প্রতি ভোটারদের অসন্তোষও সামনে নিয়ে এসেছে। নির্বাচনের ফলাফলকে অনেকেই ট্রাম্পের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এক ধরনের গণরায় হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে রিপাবলিকানদের ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটিগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য প্রেসিডেন্টের জন্য বড় রাজনৈতিক সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।
ভোটারদের কাছে নিজেকেই ব্যালটে হাজির করেছিলেন ট্রাম্প
মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণায় ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই নিজের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বারবার বলেছিলেন, ব্যালটে যেন তাঁকেই প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নির্বাচনী প্রচারণায় ‘মনে করুন ব্যালটে আমিই আছি’—এই বক্তব্য তিনি মোট ৪৭ বার পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, নিজের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করা।
কিন্তু ভোটাররা শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিলেও ফলাফল তাঁর প্রত্যাশার বিপরীত হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশের বদলে অনেক ভোটার রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যান করেছেন। কেউ কেউ আবার ভোটকেন্দ্রেই যাননি। ফলে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় ব্যবধানে জয় ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলকে বড় ধরনের ব্যর্থতার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে পাওয়া নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের জাতীয় ভোটে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালের পর কংগ্রেস নির্বাচনে কোনো দলের জন্য এটি সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয়। এমনকি ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন এবং ২০১০ সালে বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকাকালে রিপাবলিকানদের যে ঐতিহাসিক সাফল্য এসেছিল, এবারের ডেমোক্র্যাটদের ভোটের ব্যবধান সেগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে।
রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও ভাঙন
নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য শুধু ঐতিহ্যগতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এলাকাগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কট্টর রিপাবলিকান অধ্যুষিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও দলটির প্রার্থীদের পরাজয় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার প্রকৃত অবস্থা সামনে এনেছে।
টেক্সাসের কেন প্যাক্সটন এবং সাউথ ক্যারোলাইনার ডারলিন গ্রাহামের মতো ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পছন্দের সিনেট প্রার্থীদের পরাজয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। এসব অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের ঐতিহ্যগত শক্ত অবস্থান থাকলেও ট্রাম্পের সমর্থন প্রার্থীদের জয়ের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। বরং তাঁর সরাসরি হস্তক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রে উল্টো ফল দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এ ছাড়া রিপাবলিকানদের নির্বাচনী সুবিধা নিশ্চিত করতে সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের আসনগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য ট্রাম্প যে চাপ দিয়েছিলেন, সেটিও প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনেনি। বরং নির্বাচনী ফলাফল দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু আসনের সীমানা পরিবর্তন কিংবা দলীয় প্রার্থীদের প্রতি প্রেসিডেন্টের সমর্থন দিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ আড়াল করা সম্ভব নয়।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ। জ্বালানি তেলের আকাশছোঁয়া দাম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। খাদ্যপণ্য, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর খরচ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প নির্বাচনের আগে দ্রব্যমূল্য কমানো এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ লাঘবের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পাশাপাশি বিদেশে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ার প্রত্যাশাও তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত তাঁর সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লস অ্যাঞ্জেলেস ক্যাম্পাসের আমেরিকান রাজনীতি ও পাবলিক পলিসির অধ্যাপক লিন ভাভরেক মনে করেন, এবারের নির্বাচনে জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি ছিল অন্যতম প্রধান নিয়ামক। তাঁর মতে, এই ফলাফল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্রে স্থায়ী পরিবর্তন এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো ঠিক হবে না। তবে ট্রাম্পের প্রতি মানুষের আগের আকর্ষণ যে কমেছে, তা স্পষ্ট।
শুল্কনীতি ও অভিবাসন অভিযানেও ক্ষুব্ধ ভোটাররা
অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য ও অভিবাসন নীতিও ভোটারদের অসন্তোষ বাড়িয়েছে। আমদানি পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে ভোক্তাদের ওপর। যাঁরা নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের কাছে অর্থনৈতিক স্বস্তি প্রত্যাশা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন উল্টো বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছেন।
অন্যদিকে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ অভিবাসন বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন অভিযান নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সীমান্তে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে থাকা অনেক ভোটারও দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা মানুষের বিরুদ্ধে ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযানকে ভালোভাবে নেননি।
ভোটারদের একটি অংশ মনে করছেন, প্রশাসন সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবিক দিকগুলোও বিবেচনায় নিতে পারত। ফলে অভিবাসন নীতিতে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান তাঁর প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারেনি।
নিজের ব্যবসা ও স্বজনদের ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ
ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করেছে তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসা ও আয়-রোজগার নিয়ে ওঠা নৈতিকতার প্রশ্ন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য মুনাফাখোরির অভিযোগকে তিনি বারবার গুরুত্বহীন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে এসব বিষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যাঁরা রাজনীতির বাইরে থাকা একজন ব্যক্তিকে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন, তাঁদের কাছে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে জোর দেওয়ার পরিবর্তে ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনের আগের দিন ওয়াশিংটনে নিজের পছন্দের নির্মাণ প্রকল্প এবং রিফ্লেক্টিং পুলের সামনে দাঁড়িয়ে দেওয়া বক্তব্যে তিনি শেওলা ও পাইপলাইন নিয়েও কথা বলেন। অথচ তখন ভোটারদের বড় অংশের প্রধান উদ্বেগ ছিল নিত্যপণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয় ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যা থেকে ট্রাম্পের প্রচারণার এই দূরত্ব নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
পরাজয়ের দায় এড়াতে ট্রাম্পের নতুন ব্যাখ্যা
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পরপরই পরাজয়কে নিজের বিরুদ্ধে জনগণের রায় হিসেবে মেনে নিতে চাননি ট্রাম্প। বরং তিনি দাবি করেছেন, নির্বাচনে তিনি নিজে প্রার্থী ছিলেন না। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যালটে ছিলাম না; আর আমি ছিলাম না বলেই আমরা পর্যাপ্ত ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে টানতে পারিনি।’
তবে তাঁর এই বক্তব্য রিপাবলিকান দলের ভেতরেই প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। কারণ, পুরো নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প নিজেই ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ। তিনি প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছেন, প্রচারণার কৌশল নির্ধারণ করেছেন এবং ভোটারদের কাছে নিজের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। ফলে নির্বাচনের ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তাঁর জন্য খুব বেশি নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সময় হোয়াইট হাউসের রাজনৈতিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডগলাস সসনিক এই ফলাফলকে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির প্রতি জনগণের চরম প্রত্যাখ্যান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, গত দুই বছরে রিপাবলিকানরা যেসব নীতি ও রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছে, ভোটাররা তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। সসনিকের ধারণা, নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি নতুন এক পরিবর্তনের পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। আগামী দুই বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
এখনই শেষ নয় ট্রাম্পের রাজনৈতিক অধ্যায়
মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেলেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক অধ্যায় এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমনটা মনে করছেন না তাঁর সমর্থকেরা। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর হাতে এখনো দুই বছর মেয়াদ রয়েছে। এই সময়ে তিনি প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করবেন।
রক্ষণশীল অর্থনৈতিক নীতির পক্ষে কাজ করা সংগঠন ক্লাব ফর গ্রোথের সভাপতি ডেভিড ম্যাকইনটোশও ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই নেতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নারাজ। তাঁর মতে, অতীতেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিদায়ের কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু প্রতিবারই তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
ম্যাকইনটোশের বক্তব্য, রিপাবলিকানদের উচিত নিজেদের মূল নীতিতে ফিরে যাওয়া। অর্থনৈতিক ও রক্ষণশীল নীতিকে সামনে রেখে কাজ করতে পারলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও দলটি জয়ী হতে পারে।
অন্যদিকে, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের অধ্যাপক লিন ভাভরেক মনে করেন, এবারের নির্বাচনে মাগা জোট পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে—এমনটা বলার সুযোগ নেই। তবে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা আগের তুলনায় কমেছে এবং তাঁর রাজনৈতিক আকর্ষণে ভাটা পড়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, নাকি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা?
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পরও ক্ষমতাসীন দল ঘুরে দাঁড়ানোর একাধিক নজির রয়েছে। ১৯৭৪ সালে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে বড় সাফল্য পেয়েছিল। তখন মনে করা হয়েছিল, রিপাবলিকানরা দীর্ঘ সময়ের জন্য রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু মাত্র ছয় বছর পর ১৯৮০ সালে রোনাল্ড রিগ্যান রিপাবলিকানদের আবার হোয়াইট হাউসে ফিরিয়ে আনেন।
একইভাবে ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন এবং ২০১০ সালে বারাক ওবামার প্রেসিডেন্সির সময় রিপাবলিকানরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছিল। অনেক বিশ্লেষক তখন দুই প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্লিনটন ও ওবামা দুজনই পুনর্নির্বাচিত হন।
তাই এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়কে ট্রাম্পবাদের চূড়ান্ত পতন হিসেবে দেখার আগে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। ভোটারদের অসন্তোষ সাময়িক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তৈরি হয়েছে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা ঘটিয়েছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
রিপাবলিকান পার্টি কি আগের অবস্থানে ফিরতে পারবে?
ট্রাম্পের নেতৃত্বে রিপাবলিকান পার্টি গত কয়েক বছরে আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। দলের ভেতরে তাঁর প্রতি অনুগত ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পেয়েছেন। অন্যদিকে, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করা কিংবা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা অনেক নেতা দলীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়েছেন।
ফোর্ডহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টিনা এম গ্রিয়ারের মতে, এখন পর্যন্ত রিপাবলিকান দলের সদস্যদের বড় অংশ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের কাছে নতি স্বীকার করেছেন। তবে এবারের নির্বাচনী ফলাফলের পর দলের ভেতরে নতুন করে মতবিরোধ ও নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের অভ্যন্তরীণ নীতি উপদেষ্টা জো গ্রোগান মনে করেন, নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। তাঁর মতে, বাণিজ্যচুক্তির উন্নয়ন এবং ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর সামরিক ব্যয় বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোকে ট্রাম্প মার্কিন রাজনীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন। তাই দলটি আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও এবারের জয়ের ব্যাখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। প্রগতিশীল অংশের নেতারা মনে করছেন, তাঁদের সমর্থকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক উদ্যম এই সাফল্যের মূল কারণ। অন্যদিকে, মধ্যপন্থীরা মনে করছেন, টেক্সাস ও কানসাসের মতো রিপাবলিকান ঘাঁটিতে অসন্তুষ্ট ভোটারদের নিজেদের দিকে টানতে পারাই ছিল জয়ের বড় কৌশল।
সাবেক শিকাগো মেয়র রাম ইমানুয়েল মনে করেন, মাগা জোটের বাইরে থাকা রিপাবলিকানদের একটি অংশ দলটির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছে। তবে ডেমোক্র্যাটরা এই নির্বাচনী সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দিতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে ২০২৭ সালে তাঁদের নেওয়া পদক্ষেপের ওপর।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনে বড় একটি সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, নেতৃত্বের ধরন এবং প্রশাসনের নীতির প্রতি ভোটারদের অসন্তোষ এবার কংগ্রেস নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে। তবে ট্রাম্পের হাতে এখনো দুই বছর সময় রয়েছে। এই সময়ে তিনি রাজনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে পারেন, আবার দলের ভেতরের বিভক্তি ও জনঅসন্তোষ আরও বাড়তেও পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ট্রাম্প-যুগের অবসান শুরু হয়েছে, নাকি এটি কেবল সাময়িক নির্বাচনী ধাক্কা—তার উত্তর মিলবে আগামী দুই বছরের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে। সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
সন্ধানী বার্তা/এসএ/এমএএইচ