যশোরের বিভিন্ন এলাকায় রেললাইনের ওপর স্থানীয়দের তৈরি করা অবৈধ ও অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং দিন দিন বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। গেটম্যান কিংবা ব্যারিয়ার না থাকায় এসব ক্রসিং দিয়ে ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন পথচারী ও যানবাহনের চালকেরা। ঘটছে দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণ। রেলওয়ে বিভাগের হিসাবেই যশোর অঞ্চলে থাকা ১৮৩টি রেলক্রসিংয়ের মধ্যে ১০১টি অবৈধ। আর বৈধ ৮২টি ক্রসিংয়ের ৩৮টিতেই নেই কোনো গেটম্যান। সর্বশেষ বুধবার (৪ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঝিকরগাছা উপজেলার গাজীরদরগাহ ফিলিং স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় একটি অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ গেছে এক কভার্ডভ্যানচালকের। এ ঘটনা আবারও সামনে এনেছে যশোরের ঝুঁকিপূর্ণ রেলক্রসিংগুলোর নিরাপত্তাহীনতার চিত্র।
ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ গেল কভার্ডভ্যানচালকের
ঝিকরগাছা উপজেলার গাজীরদরগাহ ফিলিং স্টেশনসংলগ্ন এলাকা থেকে জয়কৃষ্ণপুর গ্রামে যাতায়াতের জন্য রেললাইনের ওপর স্থানীয় বাসিন্দারা একটি লেভেল ক্রসিং তৈরি করেছেন। তবে রেলওয়ে বিভাগের অনুমোদন না থাকায় সেখানে নেই কোনো গেটম্যান বা ব্যারিয়ার। ফলে নিজ দায়িত্বেই রেললাইন পার হতে হয় পথচারী ও যানবাহনকে।
বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ওই ক্রসিং পার হওয়ার সময় বেনাপোল থেকে ছেড়ে আসা বেতনা এক্সপ্রেসের ধাক্কায় একটি কভার্ডভ্যান দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে গুরুতর আহত হন চালক আতিয়ার রহমান (৫৫)। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি ঝিকরগাছার কাটাখাল কলোনিপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। এর আগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর যশোর সদরের কৃষ্ণবাটি রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় একটি ইজিবাইককে চাপা দেয় ট্রেন। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান ইজিবাইকচালক আজিজুর রহমান ও যাত্রী এরশাদ আলী।
এক দশকে অন্তত ৮০ জনের মৃত্যু
শুধু সাম্প্রতিক এই দুটি দুর্ঘটনাই নয়, গত এক দশকে যশোর অঞ্চলে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে অন্তত অর্ধশত দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৮০ জন। এসব দুর্ঘটনার পেছনে অরক্ষিত রেলক্রসিং, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব এবং ঝুঁকি নিয়ে পারাপারের বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পাকশী বিভাগের পশ্চিমাঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, যশোর রেলওয়ে স্টেশন থেকে যশোর-বেনাপোল, যশোর-কোটচাঁদপুর ও যশোর-খুলনা রুটের যশোর অংশে মোট ১৮৩টি রেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ১০১টি অবৈধ। বৈধ ৮২টি ক্রসিংয়ের মধ্যে ৩৮টিতে কোনো গেটম্যান নেই। রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে সড়ক নির্মাণের কারণে অনুমোদনহীন রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পৌরসভারও দায় রয়েছে।
রেলওয়ের হিসাবের বাইরেও অসংখ্য ক্রসিং
সরেজমিনে দেখা গেছে, রেল বিভাগের হিসাবের বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য অবৈধ রেলক্রসিং রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এসব পারাপারের পথ তৈরি করেছেন। কিন্তু সেখানে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা। ফলে প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পার হচ্ছেন মানুষ। কিছু অরক্ষিত ক্রসিংয়ে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বসানো হলেও অধিকাংশ বোর্ডের লেখা অস্পষ্ট ও জরাজীর্ণ। কোথাও কোথাও এসব বোর্ড দূর থেকে পড়াও কঠিন। গেটম্যান না থাকায় ট্রেন আসার সময় পথচারীদের নিজেদের সতর্কতার ওপর নির্ভর করতে হয়।
যশোর-বেনাপোল রেললাইনে মোট ২৮টি রেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে চারটি ছাড়া বাকি ২৪টিতেই নেই গেটবার। অন্যদিকে যশোর-কোটচাঁদপুর রেলপথের খড়কি এলাকায় মাত্র আধা কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে সাতটি লেভেল ক্রসিং। এর মধ্যে যশোর পৌরসভার দক্ষিণ অংশের মানুষের শহরে প্রবেশের অন্যতম পথ খড়কি ধোপাপাড়ার সড়ক। এই সড়কের ওপর দিয়ে গেছে যশোর-কোটচাঁদপুর রেলপথ। গুরুত্বপূর্ণ এই ক্রসিংয়েও নেই কোনো গেটম্যান। সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও সেটির লেখার অবস্থা নাজুক। ফলে ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন মানুষকে রেললাইন পার হতে হচ্ছে।
শিশুদেরও পার হতে হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইন
খড়কি এলাকার বাসিন্দা জাকির হোসেন পলাশ বলেন, এলাকাটি খুবই জনবহুল। স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনেই এখানে লেভেল ক্রসিং তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনো গেটম্যান কিংবা ব্যারিয়ার নেই। মানুষ ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে এবং প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব রয়েছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ ব্যাপারে রেল বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা সাহেব আলী জানান, ঝুঁকিপূর্ণ রেলক্রসিংয়ের ওপারে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। প্রতিদিন শিশুরা এই রেললাইন পার হয়ে স্কুলে যায়। ট্রেনের শব্দ শুনে স্থানীয়রা সতর্ক হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এভাবে শিশুদের যাতায়াত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে দ্রুত গেটম্যান নিয়োগ জরুরি। এদিকে যশোর-বেনাপোল রেললাইনের খড়কি এলাকায় অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে কিছুটা এগোলেই মহাসড়ক। সেখানে একটি অনুমোদিত লেভেল ক্রসিং রয়েছে। ওই ক্রসিংয়ে দায়িত্ব পালন করা দুজন গেটম্যান জানান, মহাসড়কের এই অংশটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁরা নির্ধারিত সময়ে ব্যারিয়ার নামিয়ে দিলেও অনেক পথচারী নিয়ম মানতে চান না। উল্টো বাধা দিলে তাঁদের গালিগালাজ করা হয়। এতে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কায় থাকেন তাঁরা।
সমন্বয়হীনতায় বাড়ছে অবৈধ রেলক্রসিং
বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রুহুল আমিন বলেন, অনুমোদিত লেভেল ক্রসিংয়ের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনের তাগিদে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোগে অসংখ্য রেলক্রসিং তৈরি হয়েছে। কিন্তু রেলওয়ে এসব ক্রসিংয়ের বৈধতা দেয়নি। ফলে অবৈধ রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা বাড়ছে। তিনি বলেন, মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবেই স্থানীয়দের তৈরি এসব অবৈধ রেলক্রসিং মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। রেল যোগাযোগ নিরাপদ করতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
অবৈধ ক্রসিং বন্ধে পদক্ষেপের কথা রেলওয়ের
বাংলাদেশ রেলওয়ের যশোর অঞ্চলের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী চাঁদ আহমেদ বলেন, অবৈধ রেলক্রসিংগুলো স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা সরকারি সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। এসব অবৈধ ক্রসিংয়ের দুই পাশে রেলওয়ের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানো হয়। চিঠি পাওয়ার পর কোনো প্রতিষ্ঠান ক্রসিংয়ের বৈধতা চাইলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, কেউ যাতে নতুন করে অবৈধ রেলক্রসিং তৈরি করতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত রেললাইন পরিদর্শন করা হয়। অবৈধ ক্রসিং তৈরির চেষ্টা করা হলে তা প্রতিরোধ করা হচ্ছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলাও করা হচ্ছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে একের পর এক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা বলছে, শুধু সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড কিংবা সচেতনতামূলক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। জনবহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ রেলক্রসিংগুলোতে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
সন্ধানী বার্তা/এসকে/এমএসআইপি