সৌদি আরবের কিং খালিদ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনার পর দেশটির পাশে আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হামাদ বিন জাসিম বিন জাবের আল থানি। তাঁর মতে, বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে সমর্থন দেওয়া আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ইরানকে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে উল্লেখ করে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এসব মন্তব্য করেন কাতারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সৌদি আরবের প্রতি আঞ্চলিক সমর্থন এবং ইরানকে ঘিরে বিদ্যমান উত্তেজনার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
সৌদির পাশে থাকার আহ্বান
হামাদ বিন জাসিম বলেন, কিং খালিদ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা সৌদি আরবের পাশে বাস্তবসম্মত ও দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু আনুষ্ঠানিক সমর্থন নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় কার্যকর সহযোগিতা ও সমন্বিত অবস্থান জরুরি।
সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ফলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
তবে কিং খালিদ বিমানবন্দরে হামলার প্রকৃতি, দায়ী পক্ষ এবং ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখানে উল্লেখিত তথ্যের বাইরে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো বিবরণ পাওয়া যায়নি। হামাদ বিন জাসিমের বক্তব্যে হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে যে দাবি করা হয়েছে, সেগুলোও আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘ইরানই আমাদের প্রধান প্রতিপক্ষ’
নিজের পোস্টে ইরানকে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে উল্লেখ করেন হামাদ বিন জাসিম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ—জিসিসির সদস্য দেশগুলো বিভিন্ন ধরনের বৈরী তৎপরতা ও ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হচ্ছে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য, দূরদর্শিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
তাঁর এই বক্তব্যে ইরানকে ঘিরে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন সংঘাতকে কেন্দ্র করে মতপার্থক্য রয়েছে। এ বিরোধের প্রভাব ইয়েমেনসহ অঞ্চলের বিভিন্ন সংঘাত ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও আলোচিত হয়েছে।
তবে ইরানকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা হামাদ বিন জাসিমের ব্যক্তিগত বক্তব্য। এটিকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সব সদস্য দেশের অভিন্ন অবস্থান হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ইয়েমেনের হুমকি নিয়েও উদ্বেগ
ইয়েমেন থেকে আসা হুমকির প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, এসব হুমকির পরিকল্পনা ও নির্দেশনা ইয়েমেনের বাইরে থেকে আসছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানো কাতারের জন্য আরও জরুরি হয়ে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে হুমকিগুলোর উৎস, নির্দেশদাতা কিংবা ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য বিস্তারিত প্রমাণ দেওয়া হয়নি। ফলে এ দাবিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
ইয়েমেনের সংঘাত দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে যুক্ত। দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি সৌদি আরবের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দুই দেশের সীমান্ত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণে ইয়েমেন থেকে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টি বারবার আলোচনায় এসেছে।
গৌণ বিরোধ ভুলে ঐক্যের আহ্বান
হামাদ বিন জাসিম উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর প্রতি নিজেদের মধ্যকার গৌণ বিরোধ এক পাশে সরিয়ে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
জিসিসির সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে আঞ্চলিক নীতি, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে তাদের অবস্থানের মধ্যে কখনো কখনো পার্থক্যও দেখা যায়। হামাদ বিন জাসিমের বক্তব্যে এসব মতপার্থক্য অতিক্রম করে অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
তাঁর আহ্বানের তাৎপর্য হলো, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটের সময়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং পারস্পরিক বিরোধের কারণে সম্মিলিত উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়া ঠেকানো। তবে এ আহ্বানের পর জিসিসির সদস্য দেশগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে কী বার্তা দিলেন হামাদ বিন জাসিম?
২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কাতারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন হামাদ বিন জাসিম বিন জাবের আল থানি। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদের বড় একটি অংশে তিনি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি ও আঞ্চলিক সম্পর্ক নিয়ে তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
কিং খালিদ বিমানবন্দরে হামলার পর তাঁর মন্তব্য সৌদি আরবের নিরাপত্তা, উপসাগরীয় দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যে কাতার ও সৌদি আরবের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
তবে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এবং কাতারের বর্তমান সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এক নয়। একইভাবে ইরানকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বর্ণনা করাও জিসিসির সম্মিলিত সিদ্ধান্তের প্রমাণ নয়।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে হামাদ বিন জাসিম উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ইরান ও ইয়েমেনকে ঘিরে তাঁর উদ্বেগ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির জটিলতাকে সামনে এনেছে। তবে হামলার দায়, হুমকির উৎস এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও যাচাইযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
সূত্র: আল জাজিরা
সন্ধানী বার্তা/এসএ