অর্থনীতি

আকুর বিল পরিশোধে রিজার্ভে ধাক্কা

এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) জুলাই-আগস্ট মেয়াদের আমদানি বিল বাবদ ১৩৯ কোটি মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। বড় অঙ্কের এই বৈদেশিক লেনদেন নিষ্পত্তির পর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ হিসাবেও রিজার্ভ রয়েছে ৩১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার—যা আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ১.০৯ বিলিয়ন ডলার কম।

  • ১৩৯ কোটি ডলার পরিশোধের পর এক সপ্তাহে কমেছে ১.০৬ বিলিয়ন
  • নিট রিজার্ভ ২৮ বিলিয়নের কাছাকাছি
  • পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয়ের সক্ষমতা

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আকুর হিসাবে ১৩৯ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আকুর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আমদানি-রফতানি লেনদেনের দায় সাধারণত দুই মাস পরপর নিষ্পত্তি করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় জুলাই ও আগস্ট মাসের আমদানি বিল এবার পরিশোধ করল বাংলাদেশ। একসঙ্গে বড় অঙ্কের এই বিল পরিশোধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট বা গ্রোস রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে মোট রিজার্ভ ছিল ৩৭ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আকুর বিল পরিশোধের পর মোট রিজার্ভ কমেছে প্রায় ১ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বিপিএম-৬ হিসাবেও রিজার্ভ কমেছে। বৃহস্পতিবার এই হিসাবে রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা এখন দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে।

নিট রিজার্ভে স্বস্তি, মেটানো যাবে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয়
গ্রোস ও বিপিএম-৬ হিসাবের বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট ইন্টারন্যাশনাল রিজার্ভ (এনআইআর) বা প্রকৃত ব্যয়যোগ্য রিজার্ভের একটি হিসাব রয়েছে। এই তথ্য নিয়মিত প্রকাশ না করলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এনআইআর রয়েছে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। দেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের আমদানি ব্যয় হয়। সে হিসাবে বর্তমান নিট রিজার্ভ দিয়ে প্রায় পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশের।

আন্তর্জাতিকভাবে একটি দেশের অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে মোটামুটি নিরাপদ অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই বিচারে বাংলাদেশের রিজার্ভ এখনো স্বস্তিদায়ক সীমার মধ্যেই রয়েছে। তবে রিজার্ভের ওপর চাপ পুরোপুরি কেটে গেছে—এমনটি বলার সুযোগ নেই। আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক দায় মেটাতে নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন। ফলে রিজার্ভের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের প্রবাহও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

জুলাইয়ের তুলনায় এবার কম আকুর বিল
এর আগে গত ৭ জুলাই আকুর মে-জুন মেয়াদের ১৪৮ কোটি ডলারের আমদানি বিল পরিশোধ করেছিল বাংলাদেশ। ওই পরিশোধের পর বিপিএম-৬ হিসাবে দেশের রিজার্ভ দাঁড়িয়েছিল ৩১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার এবং মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার।

এবার দুই মাসের বিল হিসেবে ১৩৯ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছে, যা আগের নিষ্পত্তির তুলনায় ৯ কোটি ডলার কম। আকু মূলত সদস্য দেশগুলোর আন্তঃদেশীয় আমদানি-রফতানি লেনদেন নিষ্পত্তির একটি ব্যবস্থা। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, নেপাল ও পাকিস্তান বর্তমানে এর সদস্য। ইরানের তেহরানে আকুর সদর দপ্তর। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আমদানি ব্যয় পরিশোধের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় শ্রীলঙ্কার আকু সদস্যপদ বর্তমানে সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে।

জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন—এসক্যাপের ভৌগোলিক সীমারেখায় থাকা দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য আকুর সদস্যপদ উন্মুক্ত। বড় অঙ্কের আকু বিল পরিশোধে রিজার্ভে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হলেও, প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের নিট ব্যয়যোগ্য রিজার্ভ এবং প্রায় পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা আপাতত বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের অবস্থানকে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক রাখছে।

এম/এএইচ


সম্পর্কিত খবর