অর্থনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে ভিয়েতনামের কাছে আরও পিছিয়ে বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের সঙ্গে ভিয়েতনামের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। একসময় কাছাকাছি অবস্থানে থাকা দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে এখন রপ্তানি মূল্যের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে প্রায় দ্বিগুণে। শুধু রপ্তানি পরিমাণে নয়, পোশাকের ইউনিটপ্রতি মূল্যেও বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ভিয়েতনাম।

চলতি পঞ্জিকা বছরের প্রথম সাত মাস—জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। বিপরীতে একই সময়ে ভিয়েতনামের রপ্তানি কমেছে মাত্র ১ শতাংশ। ফলে প্রধান এই বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৪৬৬ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৯৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কমেছে প্রায় ৩২ কোটি ডলার।

অন্যদিকে, একই সময়ে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানি করেছে ৯৩৭ কোটি ডলারের। গত বছরের একই সময়ে দেশটির রপ্তানি ছিল ৯৪৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ ভিয়েতনামের রপ্তানি কমেছে মাত্র ৯ কোটি ডলার।

ফলে আলোচ্য সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের চেয়ে ভিয়েতনাম প্রায় ৪৭১ কোটি ডলার বেশি পোশাক রপ্তানি করেছে। অর্থাৎ ভিয়েতনামের রপ্তানি বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ।

শুধু পরিমাণে নয়, দরের খেলাতেও পিছিয়ে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের আরেকটি জায়গা হলো পোশাকের ইউনিটপ্রতি মূল্য। অটেক্সার তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য বেড়েছে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ।

কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশের পোশাকের ইউনিটপ্রতি মূল্য কমেছে ২ দশমিক ২৬ শতাংশ। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও ইউনিট মূল্য কমেছে, তবে তা বাংলাদেশের তুলনায় কম—১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ বৈশ্বিক পোশাক বাজারে চাহিদা ও দামের চাপ থাকলেও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের কম দামে পণ্য ছাড়তে হচ্ছে। এতে রপ্তানির পরিমাণ ধরে রাখলেও আয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। চীনের পতন, তবু লাভ ভিয়েতনামের যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ভিয়েতনাম। দ্বিতীয় বাংলাদেশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা চীনের রপ্তানি পরিস্থিতি আরও দুর্বল হয়েছে। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ। দেশটি রপ্তানি করেছে প্রায় ৪৫৬ কোটি ডলারের পোশাক। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৬৯২ কোটি ডলার। চীনের বড় পতনের বিপরীতে ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকায় মার্কিন বাজারে দেশটির অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে।

এগিয়ে যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়া-কম্বোডিয়াও
বাংলাদেশের অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরাও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভালো করছে। চতুর্থ অবস্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়ার পোশাক রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ। সাত মাসে দেশটি রপ্তানি করেছে ২৭৪ কোটি ডলারের পোশাক, যা গত বছর ছিল ২৬৭ কোটি ডলার। পঞ্চম অবস্থানে থাকা কম্বোডিয়ার রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। দেশটির রপ্তানি ২৩৭ কোটি ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ২৬২ কোটি ডলার। অন্যদিকে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা ভারতের রপ্তানি কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। দেশটি সাত মাসে ২৪৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩৩০ কোটি ডলার।

সংকুচিত মার্কিন বাজারে লড়াই আরও কঠিন
সার্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানিও কমেছে। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৪ হাজার ১৮৩ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার। অর্থাৎ বাজারটি সংকুচিত হয়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার হার যখন ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, তখন ভিয়েতনাম মাত্র ১ শতাংশ পতন সামলে বাজার ধরে রেখেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতার ব্যবধান আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভিয়েতনামের সঙ্গে বাড়তে থাকা ব্যবধান শুধু একটি বাজারের পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের সামনে মূল্য, পণ্যের বৈচিত্র্য, উৎপাদন দক্ষতা ও বাজার প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর বড় বার্তাও দিচ্ছে।

এম/এএই


সম্পর্কিত খবর