দেশজুড়ে

নদীগর্ভে বসতভিটা-ফসলি জমি, মধুমতির ভাঙনে নিঃস্ব বহু পরিবার

একসময় যে জমিতে ধান-পাটের সবুজ সমারোহ ছিল, সেখানে এখন শুধু নদীর স্রোত। যে বাড়িতে ছিল সংসারের কোলাহল, ভাঙনের আতঙ্কে সেই বাড়িও ছেড়ে দিতে হয়েছে। বছরের পর বছর মধুমতির ভাঙনে এমনই বদলে গেছে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ঘোষপুর ইউনিয়নের লংকারচরের চিত্র।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নদীভাঙনে ইতোমধ্যে পাড়াটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জমি বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট অংশও রয়েছে ভাঙনের ঝুঁকিতে। ফলে শেষ সম্বলটুকু রক্ষা হবে কি না—এই উৎকণ্ঠায় প্রতিদিন কাটছে নদীপাড়ের মানুষের।

স্থানীয়দের ভাষ্য, শুধু জমি নয়, বছরের পর বছর নদী কেড়ে নিয়েছে বসতভিটা, কৃষিজমি ও জীবিকার অবলম্বন। একাধিক পরিবারকে বাড়িঘর সরিয়ে নিতে হয়েছে। কেউ সড়কের পাশে, আবার কেউ অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে কোনোভাবে টিকে আছেন।

ভাঙনের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির চিত্র উঠে আসে আরতী গোয়ালীর কথায়। প্রায় ৩০ বছর আগে বিয়ের পর থেকে তিনি এ এলাকায় নদীভাঙন দেখে আসছেন। তার ভাষ্য, প্রতিবছরই একটু একটু করে তাদের জমি ও বসতভিটা নদীর গর্ভে চলে গেছে।

আরতী বলেন, একসময় তাদের পরিবার স্বাবলম্বী ছিল। এখন তারা প্রায় ভূমিহীন। বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে অল্প জমি কিনে ঘর তুলেছেন। নদীর পাড়ের পুরোনো বসতঘরটিও ভাঙনের আশঙ্কায় ছেড়ে দিয়েছেন।

তার অভিযোগ, মধুমতি থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে বর্ষায় নদীভাঙন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

চলতি বছরও এলাকায় নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনের তীব্রতা এখন তুলনামূলক কম হলেও নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্ক বাড়ছে স্থানীয়দের। তাদের আশঙ্কা, শেষ আশ্রয়টুকুও কখন নদীগর্ভে চলে যায়, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সরেজমিনে লংকারচর নীচুপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, মধুমতির তীরের কয়েকটি স্থানে নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। বর্তমানে ভাঙনের তীব্রতা তুলনামূলক কম হলেও নদীর খুব কাছেই রয়েছে বসতভিটা ও কৃষিজমি। ফলে বর্ষায় পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে শঙ্কায় স্থানীয়রা।

তাদের আশঙ্কা, অবশিষ্ট জমিটুকু নদীতে চলে গেলে অনেক পরিবারই কার্যত ভূমিহীন হয়ে পড়বে। তাই ভাঙন শুরু হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেভাগেই স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মধুমতির ভাঙনে আরতী গোয়ালীর বসতভিটা, বিধান বদ্দীর মরিচ ও ঘাসের জমিসহ হরশিত, ননী, অচিন্ত গোয়ালী, জীবানন গোয়ালী, রঘুনাথ মণ্ডল ও আনিতা মণ্ডলসহ প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি পরিবারের বাড়িঘর ও কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

এসব পরিবারের অনেকেরই জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল কৃষিজমি। জমি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের আয় ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।

নদীভাঙনের সঙ্গে জীবিকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন আনিতা মণ্ডল। তার কথায় উঠে আসে ভাঙনকবলিত মানুষের আরেক বাস্তবতা।

আনিতা বলেন, নারী-পুরুষ সবাই কাজ করে সংসার চালান। নদী তাদের কৃষিজমি কেড়ে নিয়েছে। সরকারি সহায়তায় পাওয়া ভেড়া পালন করে এখন জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। ভেড়ার খাবারের জন্য নিজেকেই নৌকা চালিয়ে কখনো জেগে ওঠা চরে, কখনো নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যেতে হয়।

স্থানীয়দের অন্যতম অভিযোগ নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন নিয়ে। তাদের দাবি, নিয়ম না মেনে বালু তোলার কারণে নদীর গতিপথ ও তীরের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বর্ষায় ভাঙনের মাত্রা বেড়ে যায়।

রঘুনাথ মণ্ডল বলেন, প্রতিবছর বাড়িঘর সরাতে সরাতে তারা নদী থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন। কিন্তু তাতেও ভাঙনের আতঙ্ক কাটেনি। তার আশঙ্কা, অবশিষ্ট জায়গাটুকুও নদীতে চলে গেলে তাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকবে না।

বালু উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে ঘোষপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমরান হোসেন নবাব বলেন, ইউনিয়নের কিছু এলাকায় নদীভাঙন হয়। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন অনেকাংশে দায়ী। নিয়ম মেনে বালু উত্তোলন করা হলে ক্ষতিকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।

বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম রকিবুল হাসান বলেন, মধুখালী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলার অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্লক স্থাপনের মাধ্যমে নদীশাসনের কাজ করছে। বোয়ালমারীর অংশে ভাঙন দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি


সম্পর্কিত খবর