রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর প্রথমবার নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে রাজনৈতিক সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর বক্তব্যে একই সঙ্গে উঠে এসেছে গণতন্ত্রকে টেকসই করা, রক্তপাত এড়িয়ে সুন্দর ও সম্প্রীতির সমাজ গড়া, মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং তরুণ প্রজন্মকে আত্মনির্ভর করে তোলার তাগিদ।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় মাঠে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তিনি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজ জেলায় এটিই ছিল তাঁর প্রথম সফর। তাঁকে স্বাগত জানাতে এদিন মাঠজুড়ে মানুষের ঢল নামে। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
সংঘাতের রাজনীতি নয়, সমঝোতার পথ
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তাঁর সংঘাত পরিহারের আহ্বান। তিনি বলেন, হানাহানি-সংঘর্ষ নয়, আলাপ-আলোচনা আর সমঝোতার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। রাজনৈতিক বিভাজন ও সংঘাত যখন দেশের স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে, তখন রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যে মূলত রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রয়োজনীয়তাই সামনে এসেছে। তাঁর বার্তায় স্পষ্ট—গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই পার্থক্যের সমাধান সংঘাতের মাধ্যমে নয়, আলোচনার টেবিলে হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক ত্যাগের বিনিময়ে গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছি। আমরা আর রক্তপাত দেখতে চাই না। আমরা একটি সুন্দর সমাজ দেখতে চাই, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি দেখতে চাই।’ রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—গণতন্ত্র ফিরে পাওয়া যথেষ্ট নয়, সেটিকে ধরে রাখাও জরুরি। তিনি বলেন, ‘অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা যে গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছি, আমরা সেই গণতন্ত্র আর হারাতে চাই না।’ তাঁর বক্তব্যে গণতন্ত্রকে শুধু রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে নয়, শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল সমাজব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবেও দেখার আহ্বান রয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নেও অগ্রাধিকার
নিজ জেলার মানুষের সামনে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়ন প্রসঙ্গও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঠাকুরগাঁও জেলা অনেকটাই অবহেলিত। আমি চেষ্টা করেছি ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের জন্য কিছু করার।’ দীর্ঘদিনের দাবির কথা তুলে ধরে তিনি জানান, ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বিমানবন্দর চালুর জন্যও কাজ চলছে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একটি অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটাতে শুধু অবকাঠামো নয়, উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগব্যবস্থার সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও তাঁর বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
উন্নয়নের কেন্দ্রে কর্মসংস্থান
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের আরেকটি বড় অংশজুড়ে ছিল কর্মসংস্থান। তিনি বলেন, ‘মানুষের উন্নতির জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বেকারত্ব দূর করার জন্য আমাদের প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে।’ এই বক্তব্যে উন্নয়নের প্রচলিত ধারণার বাইরে মানুষের আয় ও কাজের সুযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, মানুষের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে উন্নয়নের সুফল সর্বস্তরে পৌঁছানো কঠিন—রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে সেই বাস্তবতাই উঠে এসেছে।
তরুণদের প্রতি আত্মনির্ভর হওয়ার আহ্বান
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতির বার্তাও ছিল স্পষ্ট। তিনি তরুণদের শুধু প্রচলিত চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আত্মনির্ভর হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের দক্ষতার পরিচয়ে নিজেকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে হবে। একটি সুন্দর সমাজ গড়তে তোমরা এগিয়ে এসো।’ একই সঙ্গে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে তরুণসহ সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সবাই মিলে রুখে দাঁড়াও।’ রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যে তরুণদের শুধু কর্মসংস্থানের প্রার্থী হিসেবে নয়, সমাজ পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে।
জনতার ভালোবাসায় আবেগঘন প্রত্যাবর্তন
রাষ্ট্রপতির সফরকে ঘিরে রোববার ঠাকুরগাঁওয়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। দুপুরে হেলিকপ্টারে তিনি জেলায় পৌঁছালে তাঁকে ঘিরে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায়। শহীদ মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়াম ও আশপাশের এলাকায় সকাল থেকেই মানুষের ভিড় জমে। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী স্বাগত জানানোর পর তাঁকে ঠাকুরগাঁও সার্কিট হাউজে নেওয়া হয়। সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে তিনি বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করেন এবং তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। বিকেলে সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় মাঠের নাগরিক সংবর্ধনায় ফুলেল শুভেচ্ছায় তাঁকে বরণ করে নেন জেলার সর্বস্তরের মানুষ।
সামনে উন্নয়নের কর্মসূচি
দুই দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে সোমবার ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধনের কর্মসূচি রয়েছে। এরপর তাঁর বঙ্গভবনে ফেরার কথা রয়েছে। তবে প্রথম দিনের বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা দিয়েছেন, সেটিই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল সংঘাতের বদলে সমঝোতা, রক্তপাতের বদলে শান্তি, বিভাজনের বদলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বেকারত্বের বদলে কর্মসংস্থান। ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতির এই বার্তা তাই শুধু নিজ জেলার মানুষের উদ্দেশে নয়; বরং জাতীয় রাজনীতির জন্যও একটি আহ্বান—মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সংঘাত নয়, আলোচনার পথই বেছে নিতে হবে।
এম/এএইচ