বুধবার , ১৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি

নতুন কাপড়

পশ্চিম আকাশে সালুর মায়ের চুলার ধোয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে কালবৈশাখীর মেঘ তৈরির বৃথা চেষ্টা করে পুনরায় মাটিতে ফিরে আসছে দেখে মন খারাপ হতে লাগল সালুর। গেল বছর শীতে সালু গুনে গুনে তিনটা হাস মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিল,কিন্তু বছর গড়িয়ে গেল-মা একটা নতুন জামা দিল না সালুকে। বাপ থাকলে কী হইত কে জানে! মাথা ব্যাথার মতোন শোক মনের ভেতরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠছিল। কিন্তু তার আগেই মা ডাক দিল। বেলা গড়ায়ে গেছে। প্রতিদিন এই সময় মা সালুকে নদীর পাড়ে পাঠায়। না যেতে চাইলেও জোর করে পাঠায়। সালুর ক্ষুধা লাগে। তবু মা নদীতে মাছ ধরতে পাঠায় তাকে। মরা নদীতে কী মাছ থাকে? থাকে করব দেওয়ার আগে নদীকে ধোয়ানোর বেবাক আয়োজন। মাছ কই! ওরা সব নদীর আত্মীয়-স্বজন। কান্তে আসে, আবার কান্দন শেষে লেজ গুটায়। ধরন কী যায়? মা বোঝে না।

নদীর ঘোলা জলের মতোন জীবন সালুর। বয়স তেরো। বুঝ জ্ঞান হওয়ার পর থেকে শুধু মাকে দেখেছে। বাবা বলে যে একটা শব্দ আছে সে সালু বুঝতে শুরু করেছে কিছুদিন আগে থেকে। শানুর বাপ যখন অনেকগুলো মোয়া আর বাতাসা নিয়ে শহর থেকে অনেকদিন পর গ্রামে ফিরেছে তখন। তবে সালুর বাবা নেই। প্রথমে শহরে একটা বস্তিতে থাকত সে। এরপর একদিন হঠাৎ মা তাকে নিয়ে আসে বালুচোরা গ্রামে। এখানে আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই তাদের। কোথাও কেউ আছে কি না জানা নেই শালুর। তবে দুইজন কাকা আছেন। তারা মাঝে মাঝে আসেন তাদের ঘরে। তবে একসাথে নয়। আলাদা আলাদা। সালুর সাথে এদের কথোপকথন কেবল আরম্ভ হচ্ছে। এই যা। একজন কাকা ভালো। সালুকে নতুন জামা কিনে দেবে বলেছে। এখন কবে দেয় সে-ই দেখার বিষয়।

মুখ ভর্তি বিরক্তি আর মনভরা ভয় নিয়ে সালু প্রতিদিনের মতোন মাছের খালি টুকরি নিয়ে ঘরের দিকে এগোয়। ঘরে ঢুকলেই মা রেগে যাবে ভয়ে কিছুক্ষণ বেড়ার চারপাশে ঘুরঘুর করে। তারপর ঘরে ঢোকে৷ প্রায় প্রতিদিনের মতো ঘরে ঢুকেই সালু দ্যাখে মা ঘুমিয়ে আছে বা জড়োসড়ো ভাবে শুয়ে আছে। সালু জাগায়। ভাত খেয়ে মা-মেয়ে নেতিয়ে পড়ে। হঠাৎ মায়ের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখে সালু পরম স্নেহে মায়ের কপালে রাত রেখে কলমি ফুলের মতোন নরম হয়ে বলে,মা তোমার নি জ্বর আসছে! মা নুয়ে পড়ে। প্রজাহীন রাজ্যে তখন সালুই রাজা। মায়ের সেবা করে মাকে সুস্থ করার রাজকার্যে সে এখন পরিষদবিহীন গবেষণা সভা ডেকেছে মনে মনে। মাথায় পানি দেওয়া,ভেজা গামছা দিয়ে কপাল মোছা সব সে করেছে। কিন্তু জ্বর কমে না। জ্বরের ঘোরে মা প্রলাপ বকছে। মাইআডা আমার ছোটো। বুঝে না। মইরা যাইব। আর দুইডা বছর, মাইয়্যাডা ছোট্ট।

বোধ জ্ঞান হলেও সালু বুঝতে পারে মা তার কথাই বলছে। মা তাকে ভালোবাসে। কিন্তু বড় হয়ে কী করতে হবে তাকে? পাশের পাড়ার ওই ছেলে মেয়েগুলোর সাথে বুঝি স্কুলে যেতে হবে? মা যদি বলে তবে সে এখনই যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো তার নতুন কোনো জামা নেই। পুরনো জামার ছেঁড়া অংশ চৌকির কাঠের সাথে লেগে তার আরেকটু ছিড়ে যায় পানি খেতে উঠতে গিয়ে। তবে যা হোক, তাকে আরেকটু বড় হয়ে কিছু একটা করতে হবে – এই কল্পনা একটি আহ্লাদিত বুদবুদ তৈরি করে তার মনের ভেতর। দৌড়ে গিয়ে মোল্লা বাড়ি বাগানে ছোট্ট কচি লাউ গাছটার ডগায় উথলে উঠা শিশিরগুলো ধরে হাতে জড়িয়ে নেয় সালু। বাগের পাশে পচা পুকুরে ডাহুকের বাচ্চাগুলো জোরে জোরে ডাকা শুরু করে। সালুও নিঃশব্দে ডাকে মা মা।

দু’চার দিন পর হঠাৎ করে দক্ষিণপাড়ায় ডাক পড়ল সালুর। ও পাড়ার মেম্বার বাড়িতে বিয়ে লেগেছে। নানান কাজ কর্ম,বিরাট আয়োজন। কাজে কর্মে হাত বাটালে ওরা খুশি হয়ে কিছু টাকা দেবে। সালু ভাবে কাজের টাকা আর বকশিশ মিলিয়ে তার একটা নতুন জামা হয়ে গেলেও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু বিয়ে বাড়ির উতপ্ত মহলে সারাদিন খাটার পর কাউকে বলার সাহসই হচ্ছে না যে তার ক্ষুধা লেগেছে। বড় বড় হাড়ি পাতিল ধোয়া, মসলা টানা, বাটনা বাটা, চাল ধোয়া, পানি আনা, পানের বাটা সবার কাছে নিয়ে যাওয়া, থালা বাসন ধোয়া – এত কাজ করা তো দূরের কথা সালু এত কিছু একসাথে কোনোদিন দেখেইনি। একদিন মা বলেছিল মায়ের নাকি গেরস্থ বাড়ি ছিল। ধান,মাছ গরু নাকি তাদের বাড়ির সামান্য বিষয় ছিল। কিন্তু তারপর….ক্ষুধায় সালু অস্থির। হঠাৎ দেখল পালকি করে সেজেগুজে বউ যাচ্ছে। বউ তারচেয়ে দু’তিন বছরেরই বড় হবে। তার মানে মা কি…লজ্জায় সালুর হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। ক’বছর গেল সালু তবে লাল শাড়ি পরে শ্বশুরবাড়ি যাবে। শাড়ি পেলে তো জামার প্রয়োজন হবে না। দৌড়ে সালু পালকিটার পেছনে পেছনে যতদূর যাওয়া যায় গেল। খালি হাতে বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে মার খেলেও আজ রাগ হলো না তার। মা…ভাত… বলে সালু ঘুমিয়ে গেল। ঘুমের মধ্যে একটা লাল ঘোড়া টগবগ করে চলে গেল কোন দিকে যেন। ঘোড়ার উপর সালু যাচ্ছে। কোথায় কোথায় কোথায়।

ঘুম ভাঙার পর পান্তা খেয়ে সালু মাকে জিগেস করল- মা! তোমার কি বিয়া হইছে? মা নির্বিকার হয়ে উত্তর দিল – না। মায়ের গলার আওয়াজ শুনে সালু বুঝল এটা অন্যায় প্রশ্ন। অপরাধীর মতো বাইরে চলে গেল। মা পেছন থেকে বলব- নদীর কাছে যা। মাছ লইয়া আসিস। জলদি আসনের দরকার নাই। বিল অব্দি যাবি। খালি পটলা আনবি না। সালু ভাবে মা তো জানে, সালু মাছ পায় না। তাহলে কেন রোজ দুপুর হলে সালুকে মা ঘরের বাইরে পাঠায়। সালু রাগ করে আজ আর গেল না। একটু দূরে লুকায়ে ডাঙ্গুলি খেলতে আরম্ভ করল। হঠাৎ করে দেখল তাদের বাড়িতে মানুষ ঢুকছে। ওই জামা দেবে বলেছিল সে-ই কাকা। সালু দৌড়ে ঘরে এসে কাকার কাছে আজ বায়না করবে। কিছুতেই আজ সালু কাকাকে ছাড়বে না। কাকার পেছন পেছন ঘরে ঢুকল সালু। আবদার করল। মা রেগে আগুন। আবদার তুলতেই কাকা ঘাড়ে হাত দিয়ে বলল, তোর তো আসলেই নতুন জামা লাগে। নতুন জামা শহরে আছে। যাবি শহরে? সালু রাজি। এখনই যেতে রাজি। মা ধমক দিয়ে বলল, আইজ না। পরে যাস। মাছ ধরন লাগে। তুই যা, মাছ ধরবার যা। কটমটিয়ে কাকা তাকায় সালুর মায়ের দিকে। আর বলে, মাইয়্যার নতুন জামা চায়, পাইব। তুইও ওর টাকায় নতুন শাড়ি পাইবি। আর লগে নতুন ঠোঁটপালিশ, লাল। রক্তের মতোন লাল। রক্ত গরমও হয়, আবার রক্ত ঠান্ডাও হয়। হা হা হা!

সালু তৈরি। নতুন জামার কিনতে যাবে। গেল বছর সে দেখেছে দুলির মামা এসে ওদের দুই ভাইবোনকে নিয়ে গেছে শহরে। জামা,জুতা,চুলের ক্লিপ, চুড়ি কত্তকিছু দিল। ওরা ওগুলো পরেই তো ইদের দিন লাটিম কিনতে গেল। এবার সালুও শহর থেকে জামাসহ ফিরে সবার চোখে তাক লাগাবে। লাল জামা হলে ভালো হয়। আর না হলে গাঢ় মেজেন্ডা। কাকার হাত ধরতে চায়নি সে। ও পথ সালুর চেনা, ভাগ্যিস আজ নদীর পাড়ে মাছ ধরতে যায়নি। মাছ! দরিয়ার মাছ ছটফটে রকমের। পাকা মাঝিরা ধরে। সালুর খুশি মাছের মতোন। সালু আজ মাছ।

কয়েক কদম যেতেই কাকা সালুর কোমর ধরে বলব-সামনে বড় রাস্তা।কত মানুষ সেইখানে। পরথম পরথম হাঁটতে কষ্ট। তারপর পা সয়া হইয়া যায়। সালু কর্ণগোচর করে না। নতুন জামা পেলে কী হতে পারে ভাবছে, আর কাকা যদি জামা না দিয়ে শাড়ি দেয় তবুও চলে। লাল শাড়ি। কল্পনা,বুদবুদ। পেছনে দাঁড়িয়ে সালুর মা। পনের বছর আগে এমনই পথ ধরে লাল শাড়ির আশায় বাড়ি ছেড়ে সোজা পৌঁছে গেছে লাল গোরস্থানে। সালু যায়, কবরে নামে পা।

লেখক: গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক।


সম্পর্কিত খবর