
ক’দিন আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন পুলিশের উচ্চপর্যায়ে রদবদল প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তখন থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল আইজিপি পদে বাহারুল আলম আর থাকছেন না। তাঁর বিদায় সময়ের ব্যাপার মাত্র। জাতীয় নির্বাচনের পরপরই পুলিশের আইজিপি পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা জোরালো হয়। তখন থেকেই অনেকগুলো নামের মধ্যে একটি নাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এই পদটির জন্য। মো. আলী হোসেন ফকির। পুলিশের অতিরিক্ত আইজি ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান। ২০২২ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। কোনো ধরনের কারণ দর্শানো ছাড়া কর্মকর্তাদের অবসরে পাঠানো নিয়ে বেশ সমালোচনা তৈরি হয়েছিল।
ওই কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন পুলিশ সুপার পদমর্যাদার আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার আলী হোসেন ফকির। ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী সরকারের পতনের পর ২৭ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার আলী হোসেনসহ আরও ৪ কর্মকর্তাকে পুলিশ বাহিনীতে পুনর্বহাল করে। এরপর তিনি পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক হন এবং এপিবিএনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ পুলিশের নতুন আইজিপি হিসেবে এবার তাকেই বেছে নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলী হোসেন ফকিরকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়। মো. আলী হোসেন ফকির বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের সদস্য। তিনিই এখন নেতৃত্ব দিবেন বাংলাদেশ পুলিশকে।
একটি নতুন নেতৃত্বের দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ পুলিশ। সরকার বঞ্চিত, দক্ষ ও যোগ্য আলী হোসেন ফকিরকেই এই পদে দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই নতুন উদ্যমে অপারেশনাল কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বে বাহিনীর সদস্যরা। আলী হোসেন ফকিরের চাকরি জীবনের শ্রেষ্ঠ এই অর্জনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন বিশ্লেষকরা। প্রথমত, তাকে রাজনৈতিক কারণে আওয়ামী লীগ শাসনামলে একবার চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। পরে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি চাকরি ফিরে পান। এরপর আবার আওয়ামী লীগ আমলে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। সহজেই অনুমেয়, স্বৈরশাসকের বেশ আক্রোশ ছিল তাঁর প্রতি। বিএনপি সরকার এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে আইনি প্রক্রিয়ায় এসপি পদমর্যাদায় চাকরি ফিরে পান আলী হোসেন ফকির। এরপর সুপার নিউমারারি ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি। চাকরিতে তাঁর এই পুনর্বহাল ও পদোন্নতি ঘটনাবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোচ্চ বঞ্চিত দক্ষ ও অভিজ্ঞ একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাঁধে গোটা বাহিনীর গুরুদায়িত্ব তুলে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দূরদর্শী এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তে পুলিশ বাহিনীতে চাঙ্গাভাব ফিরছে। এতোদিন ভাটা পড়া অপারেশনাল কাজেও আসবে ছন্দ ও গতি। নতুন নেতৃত্বে সামনে ভালো কাজ উপহার দিতে বিভিন্ন অপারেশন প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। বাহিনীটি ক্রমশ তাঁর নেতৃত্ব আরও সুশৃঙ্খল হয়ে উঠবে এমন প্রত্যাশা দেশের সচেতন সাধারণ মানুষের।
এক নজরে আলী হোসেন ফকিরের বর্ণাঢ্য জীবন
আলী হোসেন ফকির ১৯৬৮ সালের ৫ এপ্রিল বাগেরহাট জেলার সদর থানাধীন এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্টে বি.কম অনার্স, এম.কম এবং এমবিএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৯৫ সালে ১৫তম বিসিএসের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশে সহকারী সুপার (এএসপি) পদে যোগদান করেন। কর্মজীবনে তিনি ডিআইজি-পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও ডিআইজি-এসপিবিএন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়া ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার এবং নেত্রকোনা, ফেনী ও মাগুরা জেলার এসপি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। আলী হোসেন বাংলাদেশ পুলিশের হয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কসোভো ও আইভরি কোস্ট জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি প্রশিক্ষণ এবং সরকারি কাজে যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন। বর্তমানে তিনি পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, ১৫তম বিসিএস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক, ১৫তম বিসিএস পুলিশ ফোরামের আহ্বায়ক, খুলনা ক্লাব এবং ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের সদস্য। এছাড়া তিনি ঢাকার এপিবিএন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি, বাংলাদেশ পুলিশ হ্যান্ডবল ক্লাবের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। আছেন আরও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে। তার স্ত্রী অধ্যাপক নাসিমা ফেরদৌসী সরকারি তিতুমীর কলেজে ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন। পারিবারিক জীবনে তিনি এক পুত্র এবং এক কন্যা সন্তানের বাবা। তার ছেলে কুয়েটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এবং মেয়ে বুয়েটে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অধ্যয়নরত।
সন্ধানী বার্তা/এমএএএমকে






