ভ্রমণ

ভুটানের হিমবাহ হ্রদে পর্যটকদের জন্য শঙ্কা

হিমালয়ের কোলে অবস্থিত ভুটান প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। পাহাড়, হিমবাহ, নদী আর স্বচ্ছ পানির হ্রদ দেশটির সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। তবে এই অপরূপ প্রকৃতির আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা। দেশটির শত শত হিমবাহ হ্রদের মধ্যে ১৭টিকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তের মধ্যে নেমে আসতে পারে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা।

সম্প্রতি ভুটানের একটি হিমবাহ হ্রদ থেকে পানি উপচে বন্যার সৃষ্টি হলে ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়। বৃহস্পতিবারের ওই ঘটনায় প্রাণহানির খবর পাওয়া না গেলেও গাসা জেলার মো ছু নদীর তীরে অবস্থিত জনপ্রিয় প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণ গাসা ছাছুর স্থাপনা পানির তোড়ে ভেসে যায়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে ভুটানের হিমবাহ হ্রদগুলোর ঝুঁকি, অতীতের বন্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ভুটানের হ্রদগুলো কেন ঝুঁকিপূর্ণ?
ভুটানের জাতীয় জলবিদ্যা ও আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মোট ৫৬৭টি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টিকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর আগে এক সমীক্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের সংখ্যা ছিল ২৫। পরবর্তী পর্যবেক্ষণে আটটি হ্রদের ঝুঁকি তুলনামূলক কম বলে বিবেচিত হওয়ায় সংখ্যাটি কমিয়ে ১৭ করা হয়।

হিমবাহ গলে পাহাড়ের নিচু এলাকায় পানি জমে এসব হ্রদের সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে পাথর, মাটি ও হিমবাহের পলির তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে বিপুল পরিমাণ পানি আটকে থাকে। ভূমিধস, তুষারধস, অতিবৃষ্টি কিংবা দ্রুত বরফ গলার কারণে এসব বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

একপর্যায়ে বাঁধ ভেঙে গেলে হ্রদের বিপুল পরিমাণ পানি, পাথর ও মাটি পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে প্রবল বেগে নিচের দিকে ধেয়ে আসে। এ ধরনের ঘটনাকে বলা হয় হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত আকস্মিক বন্যা বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (জিএলওএফ)। এ ধরনের বন্যার ভয়াবহতা বোঝাতে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ‘আকাশের সুনামি’ শব্দটি ব্যবহার করেছে।

যেসব হ্রদ নিয়ে বেশি উদ্বেগ
ভুটানের লুনানা অঞ্চলের থোরথোরমি ও রাফস্ট্রেং হ্রদ বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। হ্রদ দুটির মাঝখানে থাকা পাথর ও পলির তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের স্থিতিশীলতা নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ রয়েছে। বাঁধটির কোনো অংশ দুর্বল হয়ে পড়লে পানি বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

২০২৩ সালে জার্নাল অব হাইড্রোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ অঞ্চলের চারটি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হ্রদ নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। হ্রদগুলো হলো বেচুং ছো, রাফস্ট্রেং ছো, থোরথোরমি ছো ও লুগে ছো।

গবেষকেরা সম্ভাব্য বন্যার বিভিন্ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, এসব ঘটনায় পানির পরিমাণ ৬ লাখ ঘনমিটার থেকে ৩০ কোটি ঘনমিটার পর্যন্ত হতে পারে। গবেষণার মডেল অনুযায়ী, এমন বন্যায় ১৬ হাজারের বেশি মানুষ এবং হ্রদ থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত বিভিন্ন অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে এগুলো সম্ভাব্য পরিস্থিতির ভিত্তিতে তৈরি হিসাব; কোনো নির্দিষ্ট হ্রদের বাঁধ ভেঙে বন্যা ঘটার নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।

অতীতেও ঘটেছে ভয়াবহ বন্যা
ভুটানে হিমবাহ হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যার ঘটনা নতুন নয়। ১৯৯৪ সালের ৬ অক্টোবর লুগে ছো হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধের একাংশ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। এতে প্রায় ২১ জনের মৃত্যু হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বহু বাড়িঘর, কৃষিজমি ও বিভিন্ন অবকাঠামো।

২০২৪ সালে ন্যাচারাল হ্যাজার্ডস অ্যান্ড আর্থ সিস্টেম সায়েন্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ২০০৯ সালে ছোজো হ্রদ এবং ২০১৫ সালে লেমথাং ছো হ্রদ থেকে বন্যার ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের নথি অনুযায়ী, ১৯৫০-এর দশক থেকে ভুটানে অন্তত ১৮টি হিমবাহ হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটেছে।

অতীতের এসব ঘটনা দেখিয়েছে, পাহাড়ি অঞ্চলে হিমবাহ হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নদী ও উপত্যকার আশপাশে বসবাসকারী মানুষ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বাড়ছে। এর প্রভাবে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে এবং নতুন নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি আগে থেকে থাকা হ্রদগুলোর আয়তনও বাড়তে পারে। উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পাহাড়ের ঢাল এবং বরফে জমাট মাটি দুর্বল হয়ে ভূমিধস ও তুষারধসের আশঙ্কাও বাড়ছে।

তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গললেই কোনো হ্রদের বাঁধ ভেঙে বন্যা হবে, এমন নয়। প্রতিটি হ্রদের পানির পরিমাণ, প্রাকৃতিক বাঁধের গঠন ও স্থিতিশীলতা এবং আশপাশের ভূপ্রকৃতির ওপর এ ঝুঁকি নির্ভর করে। ফলে সব হ্রদের ঝুঁকি একভাবে মূল্যায়ন করার সুযোগ নেই।

আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় জোর
সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবেলায় ভুটান স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, মাঠপর্যায়ের জরিপ এবং নদীর পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো হ্রদের পরিস্থিতির পরিবর্তন শনাক্ত করা এবং সম্ভাব্য বন্যার ঝুঁকি সম্পর্কে আগেভাগে সতর্ক হওয়া।

তবে কখন কোনো হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বন্যা দেখা দিতে পারে, তা নির্ভুলভাবে আগে থেকে জানা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে যথাসময়ে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়াও জরুরি। কারণ, এমন বন্যা শুরু হলে পানি ও পাথরের প্রবল স্রোত নিচের জনবসতি ও অবকাঠামোয় পৌঁছাতে খুব বেশি সময় নাও লাগতে পারে। সূত্র:এনডিটিভি

সন্ধানী বার্তা/এসএ/এএইচ


সম্পর্কিত খবর