এক্সক্লুসিভ

রাজধানীজুড়ে শব্দের তাণ্ডব

সিগন্যাল লাল, যানজটে আটকে আছে গাড়ি—তবু বিরাম নেই হর্নের। বাসের বিকট শব্দ, ট্রাকের হাইড্রোলিক হর্ন, মোটরসাইকেলের কর্কশ আওয়াজে প্রতিদিন কেঁপে উঠছে রাজধানীর সড়ক। নিষিদ্ধ হর্নের বিরুদ্ধে আইন আছে, জরিমানার বিধান আছে, অভিযানও চলছে; কিন্তু শব্দের দাপট কমছে না। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার ধোলাইখাল এলাকায় সহজেই মিলছে এসব হর্ন, আর যানবাহনে সেগুলো বসানো হচ্ছে এমনভাবে, যাতে সহজে চোখে না পড়ে।

এই শব্দযন্ত্রণা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে এবার প্রযুক্তির সহায়তা নিতে যাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। অতিমাত্রার হর্ন শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট গাড়ির অবস্থান সম্পর্কে নিয়ন্ত্রণকক্ষে সংকেত পাঠাতে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে ‘অ্যাকোয়াস্টিক ট্র্যাকিং ডিভাইস’। অন্যদিকে গাজীপুর জেলা প্রশাসন চালু করেছে ‘নো হর্ন ক্যাম্পেইন’। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—হর্নের উৎস ও বিক্রি নিয়ন্ত্রণ না করে, নিয়ম ভাঙার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে, শুধু প্রযুক্তি আর সচেতনতায় কি থামানো যাবে রাজধানীর এই শব্দসন্ত্রাস?

  • নিষিদ্ধ হর্নে অতিষ্ঠ নগরবাসী, আইন-জরিমানাতেও থামছে না শব্দসন্ত্রাস
  • অতিমাত্রার শব্দ শনাক্তে বসছে ‘অ্যাকোয়াস্টিক ট্র্যাকিং’
  • ধোলাইখালে অবাধ বেচাকেনার অভিযোগ, গাজীপুরে শাস্তির পাশাপাশি সচেতনতা

শব্দের আঘাত শরীরেও
অতিরিক্ত শব্দ কেবল কানের অস্বস্তি নয়; দীর্ঘমেয়াদে এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উচ্চমাত্রার শব্দ শ্রবণশক্তির ক্ষতি, ঘুমের ব্যাঘাত, মনোযোগের সমস্যা ও মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিন শব্দদূষণের সংস্পর্শে থাকার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির সম্পর্কও পাওয়া গেছে।

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউনেপের ২০২২ সালের প্রতিবেদনে ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে শব্দদূষণপ্রবণ শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে পরিবহনজনিত শব্দের মাত্রা ১১৯ ডেসিবল বলে উল্লেখ করা হয়। তবে শব্দের মাত্রা স্থান, সময় ও পরিমাপপদ্ধতির ভিত্তিতে পরিবর্তিত হয়; একটি পরিমাপ দিয়ে পুরো শহরের পরিস্থিতি নির্ধারণ করা যায় না। তবু রাজধানীর সড়কে উচ্চমাত্রার হর্নের ব্যাপক ব্যবহার যে উদ্বেগজনক, তা স্পষ্ট।

আইন আছে, নিয়ন্ত্রণ কোথায়?
২০২৪ সালের মে মাসে বিআরটিএ হুটার, হাইড্রোলিক হর্ন ও অন্যান্য অননুমোদিত হর্ন ব্যবহার না করার নির্দেশনা দেয়। সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট জরুরি ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ব্যবহৃত যানবাহন ছাড়া অন্য মোটরযানে তীব্র, কর্কশ, বিকট বা ভীতিকর শব্দ সৃষ্টিকারী হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ।

তবু একাধিক বাস ও ট্রাকচালকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিষিদ্ধ হর্ন সহজলভ্য হওয়ায় সেগুলোর ব্যবহার বন্ধ করা কঠিন হচ্ছে। বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাতেও অননুমোদিত হর্ন ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, নিষিদ্ধ হর্নের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে চালকদের একটি অংশের কাছে অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাঁর মতে, শুধু অভিযান ও জরিমানায় এই প্রবণতা বন্ধ করা কঠিন; প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ।

শনাক্ত হবে শব্দ, ধরা পড়বে গাড়ি?
ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ ‘অ্যাকোয়াস্টিক ট্র্যাকিং ডিভাইস’ ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন আনিসুর রহমান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ডিভাইসটি অতিমাত্রার শব্দ শনাক্ত করে নিয়ন্ত্রণকক্ষে সংকেত পাঠাতে পারে। এতে ট্রাফিক পুলিশ সংশ্লিষ্ট যানবাহন শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পাবে।

এখন যন্ত্রটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রথমে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক পয়েন্টগুলোতে পরীক্ষামূলকভাবে এটি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে পরে ব্যবহার বাড়ানোর কথা ভাবছে পুলিশ।

তবে প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করবে শব্দের উৎস নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা, গাড়ির পরিচয় নিশ্চিত করা এবং অপরাধের পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর। শনাক্তকরণের পরও যদি আইন প্রয়োগে গড়িমসি হয়, তাহলে নতুন প্রযুক্তিও প্রত্যাশিত ফল দিতে পারবে না।

বন্ধ করতে হবে নিষিদ্ধ হর্নের সরবরাহ
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের বড় বাধা শুধু চালকদের আচরণ নয়, নিষিদ্ধ হর্নের সরবরাহও। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ধোলাইখাল এলাকায় এসব হর্ন কেনাবেচা হয় এবং গাড়ির গোপন স্থানে বসানো হয়, যাতে সহজে শনাক্ত করা না যায়।

আনিসুর রহমান মনে করেন, এই বাজার নিয়ন্ত্রণ পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। বিআরটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ সড়কে হর্ন বাজানোর অপরাধ শনাক্তের পাশাপাশি আমদানি, মজুদ, বিক্রি ও যানবাহনে সংযোজনের পথও বন্ধ করতে হবে।

গাজীপুরে শাস্তির পাশাপাশি সচেতনতা
গাজীপুর জেলা প্রশাসনের ১৬ সপ্তাহের ‘নো হর্ন ক্যাম্পেইন’ ইতিমধ্যে নবম সপ্তাহে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. নুরুল করিম ভুঁইয়া। কর্মসূচির আওতায় বাসমালিকদের অননুমোদিত হর্ন অপসারণের জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, সিএনজি ও অটোরিকশাচালকদেরও কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

জেলা প্রশাসক জানান, চালকদের আচরণ পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করাই এ উদ্যোগের বিশেষ দিক। কর্মসূচির ১৫তম সপ্তাহে বিধিনিষেধ না মানা চালকদের নিয়ে সচেতনতামূলক ভিডিও প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা বোঝা যাবে নিষিদ্ধ হর্ন অপসারণ এবং পরবর্তী সময়ে এর ব্যবহার কমার পরিসংখ্যান থেকে।

হর্ন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৮ জুলাই যানবাহনের অতিরিক্ত হর্ন নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং ফিটনেসবিহীন ও পরিবেশদূষণকারী যানবাহন অপসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

কিন্তু নির্দেশনা, অভিযান ও প্রযুক্তির পরিকল্পনার পরও মূল প্রশ্নটি রয়ে গেছে—রাজধানীর সড়কে শব্দের মাত্রা কমবে কি না। নিষিদ্ধ হর্নের বাজার নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত আইন প্রয়োগ এবং চালকদের আচরণ পরিবর্তন—এই তিনটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি ছাড়া স্থায়ী ফল পাওয়া কঠিন।

ঢাকাকে শব্দদূষণ থেকে মুক্ত করতে তাই শুধু হর্ন শনাক্তের যন্ত্র বসালেই চলবে না; নিশ্চিত করতে হবে, শনাক্ত অপরাধের বিচার হচ্ছে, নিষিদ্ধ হর্নের সরবরাহ কমছে এবং সড়কে অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানোর প্রবণতা সত্যিই কমছে। শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্য মাপা হবে প্রযুক্তি কেনা বা অভিযান পরিচালনার সংখ্যায় নয়, নগরবাসীর কানে পৌঁছানো শব্দ কতটা কমল, তা দিয়ে।

সন্ধানী বার্তা/এমএসএএকে/এমকে


সম্পর্কিত খবর