জলবায়ু পরিবর্তন, আকস্মিক বন্যা ও মানসম্মত বীজের সংকট মোকাবিলায় দেশের পাঁচ জেলার ৪০টি উপজেলায় গড়ে তোলা হচ্ছে ‘সীড ভিলেজ’ বা বীজ প্রযুক্তি গ্রাম। এ উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকেরা নিজের জমিতে উন্নতমানের বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহ করতে পারবেন। এতে বীজের জন্য বাজার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় স্থানীয়ভাবে বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) বাস্তবায়নাধীন বি-স্ট্রং প্রকল্পের কৃষি পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৪০টি উপজেলায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সীড ভিলেজ গড়ে উঠলে কৃষকদের মানসম্মত বীজের জন্য বাইরের প্রতিষ্ঠান ও বাজারের ওপর নির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি নিজেদের উৎপাদিত বীজ অন্য কৃষকদের কাছে সরবরাহ ও বিক্রির মাধ্যমে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হবে। আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ও যান্ত্রিকীকরণের ব্যবহার বাড়িয়ে ফসলের উৎপাদন ২ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে। এ কার্যক্রমে অন্তত ৩০ শতাংশ নারীসহ কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিটি উপজেলায় একাধিক বীজ প্রযুক্তি গ্রাম
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব এলাকায় বছরে দুই মৌসুমে ধান এবং অন্য মৌসুমে গম, ডাল, তেল ও মসলাজাতীয় ফসল চাষের সুযোগ রয়েছে, সেসব এলাকাকে বীজ প্রযুক্তি গ্রাম স্থাপনের জন্য নির্বাচন করা হচ্ছে। প্রতিটি উপজেলায় বিভিন্ন ফসলের বীজ উৎপাদনের জন্য একাধিক বীজ প্রযুক্তি গ্রাম গড়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে।
এ কার্যক্রমে উন্নতমানের ভিত্তিবীজ এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত উন্নত জাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বীজ উৎপাদনের আধুনিক প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন ফসলের ওপর প্রদর্শনী স্থাপন করা হচ্ছে। ধানের ক্ষেত্রে দুই মৌসুমে ১০ বিঘা করে মোট ২০ বিঘা জমিতে আবাদ করা হবে। এতে অংশ নেবেন পাঁচ থেকে ১০ জন কৃষক। গম, ডাল ও তেলজাতীয় ফসলের প্রতিটির জন্য তিন বিঘা করে জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে পেঁয়াজ, মরিচ ও ধনিয়াসহ মসলাজাতীয় ফসলের প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে এক বিঘা জমি।
উৎপাদন ও সংরক্ষণে বিশেষ নজর
বীজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি ও প্রকল্পের প্রতিনিধিরা যৌথভাবে মাঠ পরিদর্শন করছেন। প্রতিটি বীজ প্রযুক্তি গ্রামে অন্তত তিনবার রোগিংয়ের মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের গাছ অপসারণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সঠিক দূরত্বে চারা রোপণ, আগাছা দমন ও সুষম সার প্রয়োগের মতো প্রযুক্তিগত বিষয় অনুসরণ করা হচ্ছে।
প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, দুই হাজার ৪০০ বিঘা জমি থেকে এক হাজার ৪৪০ মেট্রিক টন ধানবীজ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ৩৬০ বিঘা জমিতে ১৩৫ মেট্রিক টন গমবীজ, ৩৬০ বিঘায় ৭২ মেট্রিক টন ডালবীজ এবং ৩৬০ বিঘা জমিতে ৫৭ দশমিক ৬০ মেট্রিক টন তেলবীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
একইভাবে ১২০ বিঘা জমি থেকে ৪ দশমিক ৮ মেট্রিক টন মসলাজাতীয় ফসলের বীজ এবং আরও ১২০ বিঘা জমি থেকে ১২০ মেট্রিক টন কন্দ উৎপাদনের প্রাক্কলন করা হয়েছে।
উৎপাদিত বীজের গুণগত মান বজায় রাখা ও দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের জন্য প্রতিটি বীজ প্রযুক্তি গ্রামে ময়েশ্চার মিটার, বীজ সংরক্ষণ পাত্র, ত্রিপল, বস্তা সেলাইয়ের যন্ত্র, সিলার মেশিন ও ওজন পরিমাপক যন্ত্র সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি বীজ প্রযুক্তি গ্রামে অন্তত দুই হাজার ৫০০ কেজি ধানবীজ, ৬০০ কেজি গমবীজ, ২০০ কেজি ডালবীজ ও ১০০ কেজি তেলবীজ সংরক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া দুই কেজি পেঁয়াজবীজ অথবা ২০০ কেজি পেঁয়াজের কন্দ সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বীজের লেনদেনের তথ্য থাকবে নিবন্ধনে
বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বীজের লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। কোন কৃষক কার কাছে কত পরিমাণ বীজ বিক্রি বা বিনিময় করছেন, তা নিবন্ধনে লিপিবদ্ধ করবেন সংশ্লিষ্ট উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা। এসব তথ্যের প্রতিবেদন প্রতি তিন মাস পরপর প্রকল্প কার্যালয়ে পাঠানো হবে।
এর ফলে কোন এলাকায় কী পরিমাণ বীজ উৎপাদিত হচ্ছে, কোথায় কত বীজ সংরক্ষিত রয়েছে এবং কৃষকদের মধ্যে কী পরিমাণ বীজ লেনদেন হচ্ছে, সে বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে বন্যা বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বীজের সংকট দেখা দিলে স্থানীয় পর্যায় থেকেই বীজ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে।
কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে আশাবাদ
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কৃষক আবু আহম্মেদ বলেন, তাঁরা এখন নিজেদের বীজের চাহিদা নিজেরাই পূরণ করতে পারছেন। পাশাপাশি অন্য কৃষকদেরও বীজ সরবরাহ করতে পারছেন। সীড ভিলেজের মাধ্যমে ভালো মানের বীজের ঘাটতি পূরণ হবে বলে আশা করছেন তিনি। আগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বীজ কিনে অনেক সময় প্রতারিত হতে হতো বলেও জানান তিনি।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোনায়েদ কবির খান বলেন, এ অঞ্চলের মাটি কৃষিকাজের জন্য বেশ উপযোগী এবং ফসলের নিবিড়তাও বেশি। কৃষকেরা সাধারণত একই জমিতে বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল আবাদ করেন। সঠিক পরামর্শ ও আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত ফসল থেকে বীজ সংরক্ষণ করতে পারলে মানসম্মত বীজের সংকট অনেকটাই দূর হবে।
কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, সীড ভিলেজ গড়ে উঠলে কৃষকেরা নিজেরাই মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারবেন। পাশাপাশি বীজ উৎপাদন ও বিপণনের মাধ্যমে এটিকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবেও গড়ে তোলার সুযোগ থাকবে।
বি-স্ট্রং প্রকল্পের পরিচালক কৃষিবিদ সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, পাঁচ জেলার ৪০টি উপজেলায় সীড ভিলেজ গড়ে তোলার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে মানসম্মত বীজ উৎপাদক দল তৈরি করা হচ্ছে। এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং কৃষকদের নিজস্ব বীজ উৎপাদক ও বিক্রেতা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সন্ধানী বার্তা/ডিএইচ/এমএসআইপি