মরক্কো থেকে ভুটান যাওয়ার পথে ঢাকায় প্রায় দুই ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। এই স্বল্প সময়েই তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল। আলোচনায় উঠে এসেছে ফিফার সহযোগিতা বৃদ্ধি, ইউরোপের দেশগুলোর বিপক্ষে খেলার সুযোগ, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন, ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রামের অব্যবহৃত অর্থ এবং দেশের স্টেডিয়াম অবকাঠামোর উন্নয়ন।
রোববার ঢাকায় ইনফান্তিনোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাফুফে সভাপতি ও সহসভাপতিদের নিয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধিদল। বৈঠক শেষে তাবিথ আউয়াল জানান, বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নে চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি হলে ফিফা সভাপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ জানানোর সুযোগ তৈরি হবে। তাঁর ভাষ্য, ইনফান্তিনো যেকোনো সময় বাংলাদেশে আসতে প্রস্তুত। বৈঠকের অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল ভবিষ্যতে ফিফার সঙ্গে বাংলাদেশ কীভাবে আরও বেশি কাজ করতে পারে। তাবিথ আউয়াল বলেন, দুই ঘণ্টার ট্রানজিটের মধ্যেই বাফুফের প্রতিনিধিদল ফিফা সভাপতির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে। বৈঠকটি ভালো পরিবেশে হয়েছে এবং ইনফান্তিনো বাংলাদেশের উদ্দেশে একটি ভিডিও বার্তাও দিয়েছেন।
তাবিথ জানান, ফিফা সভাপতি বাংলাদেশের আসিয়ান কাপে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা জানতে চেয়েছেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হলে বাংলাদেশ অংশ নিতে আগ্রহী কি না, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ফুটবলের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ফিফার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়াই ছিল আলোচনার মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশের ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাড়াতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিপক্ষে খেলার সুযোগ তৈরির বিষয়েও কথা হয়েছে। তাবিথ আউয়াল বলেন, বাংলাদেশ আরও বেশি ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে খেলতে চায় এবং ইউরোপেও খেলতে আগ্রহী। এ জন্য ফিফা উইন্ডো আরও উন্মুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, বিভিন্ন মহাদেশের ফুটবল কনফেডারেশনের দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক খেলার সুযোগ বাড়লে বাংলাদেশের মতো দেশের আন্তর্জাতিক ফুটবলে অংশগ্রহণের পরিসরও বাড়তে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সূচি, প্রতিপক্ষ বা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানাননি বাফুফে সভাপতি।
ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রামের আওতায় বরাদ্দ অর্থের যে অংশ এখনো ব্যয় করা হয়নি, তা নিয়েও ইনফান্তিনোর সঙ্গে আলোচনা করেছেন তাবিথ আউয়াল। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো প্রস্তুত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজ এগিয়ে গেলে ফিফা সভাপতি বাংলাদেশে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে সেগুলোর উদ্বোধন করতে পারেন। তাবিথের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পগুলোর প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নে গতি আনা গেলে ফিফার সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা আরও দৃশ্যমান হবে। তবে অব্যবহৃত অর্থের পরিমাণ, প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ কিংবা কাজ শুরুর নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
বাংলাদেশে ফিফা সভাপতির সফরের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী তাবিথ আউয়াল। তিনি বলেন, বাফুফের টেকনিক্যাল সেন্টারের কাজ শুরু হলে, সিলেটে হাইব্রিড পিচ নির্মাণের কাজ এগোলে অথবা দুটি স্টেডিয়ামের সংস্কার ও ফ্লাডলাইট স্থাপনের কাজ শুরু হলে ইনফান্তিনোর বাংলাদেশ সফরের বাস্তব কারণ তৈরি হবে। তাবিথ বলেন, এসব প্রকল্পের অগ্রগতি হলে ফিফা সভাপতি বাংলাদেশে আসতে পারেন। তাঁর ভাষায়, “প্রেসিডেন্ট ইজ রেডি টু কাম এনিটাইম।” তবে কোন দুটি স্টেডিয়ামে সংস্কার ও ফ্লাডলাইট স্থাপনের কাজ হবে, প্রকল্পগুলোর ব্যয় কত এবং কখন কাজ শুরু হবে—এসব বিষয়ে বৈঠক-পরবর্তী বক্তব্যে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। ফুটবলের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার এবং তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও ফিফা সভাপতিকে জানিয়েছেন তাবিথ আউয়াল।
তিনি বলেন, দেশের স্টেডিয়ামগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে আলোর ব্যবস্থা করার পরিকল্পনার কথা ইনফান্তিনোকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে চতুর্থ শ্রেণি থেকে স্কুল পর্যায়ে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ সম্পর্কেও তাঁকে অবহিত করা হয়েছে। তাবিথের দাবি, এসব পরিকল্পনা ও অগ্রগতির কথা শুনে ফিফা সভাপতি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে স্কুলে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে কিংবা স্টেডিয়ামগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পরিকল্পনা কবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
ইনফান্তিনোর সঙ্গে বৈঠকে ফিফা সভাপতি নির্বাচন কিংবা কোনো রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি বলে স্পষ্ট করেছেন তাবিথ আউয়াল। তাঁর ভাষ্য, বৈঠকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়ন। তাবিথ জানান, ১৮ নভেম্বর ফিফা সভাপতি পদে কারা মনোনয়ন জমা দেন, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে বাফুফে। এরপর এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান নেওয়া বা প্রকাশ করার সুযোগ আসতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ফিফার কাছে বাংলাদেশের ফুটবল গুরুত্ব পাচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তাবিথ আউয়াল বলেন, তাঁর বিশ্বাস, বাংলাদেশের ফুটবল অগ্রাধিকার পেয়েছে। ফিফা সভাপতি সরেজমিনে বিভিন্ন তথ্য ও চলমান কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারলে বাংলাদেশের উদ্যোগগুলো নিয়ে ইতিবাচক ধারণা পাবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ফিফার কাছ থেকে আরও আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা পাওয়ার প্রত্যাশার কথাও জানান বাফুফে সভাপতি। তাঁর মতে, বাংলাদেশের ফুটবলে উন্নয়নের সম্ভাবনা ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে, আর সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। তাবিথ আরও বলেন, বাংলাদেশ প্রতিটি ফিফা ইভেন্টে অংশগ্রহণ করছে। তাঁর মতে, এতে ফিফার কাছে বাংলাদেশের ফুটবল ফেডারেশনের আন্তরিকতা এবং ফুটবলের প্রতি সরকারের আগ্রহের বিষয়টি তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে।
সন্ধানী বার্তা/ডিএইচ/এমএসআইপি