যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি না থাকলে দেশটিতে পেট্রোলের দাম বর্তমানের তুলনায় তিন গুণ বেশি হতে পারত। তাঁর মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন সচল রাখতে মার্কিন নৌবাহিনী ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের অবসান হলে জ্বালানির দাম কমতে শুরু করবে বলেও আশাবাদ প্রকাশ করেছেন তিনি।
রোববার (১৮ অক্টোবর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসের একটি টাউন হল অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন ভ্যান্স। পরে তাঁর বক্তব্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের উচ্চমূল্য, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা নিয়ে কথা বলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট।
পেট্রলের উচ্চমূল্যের জন্য ইরানকে দায়ী করলেন ভ্যান্স
ভ্যান্স স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে পেট্রলের দাম অনেক বেশি। তবে এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য তিনি ইরানের কর্মকাণ্ড এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সৃষ্ট বাধাকে দায়ী করেন। তাঁর দাবি, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া এবং তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ভ্যান্সের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহকে কার্যত বাধাগ্রস্ত করার এমন পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে একটি দেশ, এমন পরিস্থিতি আমরা আগে কখনো দেখিনি।’
তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ওয়াশিংটন বর্তমান জ্বালানি সংকটের জন্য ইরানের পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছে। তবে পেট্রোলের দামের ওপর যুদ্ধের প্রভাব নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ, পরিবহনব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও।
হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি কেন গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের দিকে যাওয়ার এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানি কার্যক্রমের সঙ্গে এই প্রণালি সরাসরি যুক্ত।
এ কারণে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নয়, এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জ্বালানির বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে। তেলবাহী জাহাজের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে পরিবহন ব্যয়, বিমা খরচ এবং সরবরাহসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাপর্যায়ে জ্বালানির দামেও পড়তে পারে।
ভ্যান্সের দাবি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাসের পরিবহন সচল রাখতে মার্কিন নৌবাহিনী কাজ করছে। এই সামরিক উপস্থিতি না থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষকে পেট্রল কিনতে বর্তমানের তুলনায় তিন গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতে পারত।
‘মার্কিন বাহিনী সরে গেলে খরচ আরও বাড়বে’
হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর ভূমিকার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সেখান থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয় এবং ইরানকে ওই জলপথে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়, তাহলে মার্কিন নাগরিকদের জ্বালানি কেনার জন্য অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।
তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হলো, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানির বাজারের সঙ্গেও সম্পর্কিত। এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পেট্রল ও অন্যান্য জ্বালানির বাজারেও পড়তে পারে।
তবে পেট্রলের দাম তিন গুণ বেড়ে যাওয়ার যে সম্ভাবনার কথা ভ্যান্স উল্লেখ করেছেন, সেটি তাঁর নিজস্ব দাবি। তাঁর বক্তব্যে এই হিসাবের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক মডেল, সময়সীমা বা বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়নি। ফলে বিষয়টিকে নিশ্চিত মূল্যপূর্বাভাসের পরিবর্তে সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর রাজনৈতিক ও কৌশলগত মূল্যায়ন হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
হরমুজে জাহাজ চলাচল সচল রাখা ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার
ভ্যান্স জানান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে থাকবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা গেলে বাজারে সরবরাহসংক্রান্ত চাপ কমতে পারে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তেলবাহী ট্যাংকারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা তীব্র হতে পারে। কারণ, বাজারে সরবরাহ অব্যাহত থাকলেও ভবিষ্যতে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। একইভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হলে এবং জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি কমলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের অবসান ঘটানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও প্রতিশ্রুতি চায় যুক্তরাষ্ট্র
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি ইরান যাতে তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন না করে, সে বিষয়ে দেশটির কাছ থেকে যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতি আদায় করতে চায় ওয়াশিংটন। ভ্যান্সের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য শুধু তাৎক্ষণিক সামরিক সংঘাত মোকাবিলা করা নয়; বরং ভবিষ্যতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ কমানোও তাদের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ ক্ষেত্রে যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কেবল রাজনৈতিক আশ্বাস নয়, ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো ব্যবস্থা চায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ ধরনের সমঝোতা অর্জন করতে হলে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার অগ্রগতি এবং শর্তের বিষয়ে ঐকমত্য প্রয়োজন হবে।
যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির দাম কমার আশা
ভ্যান্স আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির দাম কমতে শুরু করবে। যুদ্ধের অবসান ঘটলে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি, জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে যুদ্ধ শেষ হলেই জ্বালানির দাম দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছাড়াও পরিশোধন ব্যয়, পরিবহন খরচ, সরবরাহব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারের পরিস্থিতি পেট্রলের মূল্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেও সময় লাগতে পারে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা, ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পরিণতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ভবিষ্যৎ—এই তিনটি বিষয় আগামী দিনে তেলের বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ভ্যান্সের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি যুদ্ধের অবসানের মাধ্যমে মূল্যচাপ কমার প্রত্যাশাও সামনে এসেছে। সূত্র: আল জাজিরা
সন্ধানী বার্তা/এএইচ/এসএ