কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশের শোবিজ অঙ্গনে। তারকাদের ছবি ও কণ্ঠ নকল করে তৈরি করা হচ্ছে আপত্তিকর গান ও ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব কনটেন্টে এমন বক্তব্য ও পরিবেশনা তুলে ধরা হচ্ছে, যা সংশ্লিষ্ট শিল্পীরা কখনো বলেননি বা করেননি। এতে ব্যক্তিগত সম্মানহানি, মানসিক চাপ ও অনলাইন হয়রানির ঝুঁকি বাড়ছে।
অভিনেত্রী সাবিলা নূর, মেহজাবীন চৌধুরী, সংগীতশিল্পী ও অভিনেত্রী জেফার রহমান, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদির এবং সংগীতশিল্পী তাসরিফ খানকে ঘিরে এ ধরনের এআই-নির্মিত কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা সামনে এসেছে। কোথাও তারকাদের কণ্ঠ ব্যবহার করে আপত্তিকর সংলাপ বলানো হয়েছে, আবার কোথাও কনসার্টের ভিডিওর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে কৃত্রিমভাবে তৈরি গান।
প্রযুক্তির নিখুঁত নকলের কারণে অনেক দর্শক প্রথম দেখায় এসব কনটেন্টকে সত্য বলে মনে করতে পারেন। যাচাই ছাড়াই ভিডিও শেয়ার করার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আইনি পদক্ষেপ নিতে চান তাসরিফ
সংগীতশিল্পী তাসরিফ খানের একটি কনসার্টের ভিডিও ও কণ্ঠ ব্যবহার করে ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ শিরোনামে একটি গান ছড়িয়ে পড়েছে। এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি গানটিকে তাঁর পরিবেশনা বলে ভুল করছেন অনেকে। বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন এই সংগীতশিল্পী।
তাসরিফের ভাষ্য, প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিপোর্ট করে গানটি সরানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু গানটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় তা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে কিছু মানুষ গানটিকে কেন্দ্র করে তাঁকে হয়রানি করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
গানটি প্রথম কারা তৈরি করেছেন বা কোথা থেকে ছড়িয়েছেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা নেই জানিয়ে তাসরিফ বলেন, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বিশ্লেষণ করে মূল উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এ কারণে তিনি বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবিলা করতে চান। তাঁর দাবি, তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।
তাসরিফ আরও জানান, যে কনসার্টের ভিডিও ব্যবহার করে গানটি ছড়ানো হয়েছে, সেটি হয়েছিল ঠাকুরগাঁওয়ে।
মানসিক ট্রমায় সাবিলা নূর
এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও নিয়ে নিজের এবং সহকর্মীদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন অভিনেত্রী সাবিলা নূর। তাঁর মতে, এসব কনটেন্টের কারণে তিনি ও তাঁর কয়েকজন সহকর্মী মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
সাবিলা নূর মনে করেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড অপরাধের শামিল। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অন্যদিকে, অভিনেত্রী ও সংগীতশিল্পী জেফার রহমানের ছবি ও কণ্ঠ ব্যবহার করেও আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এসব নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ না জানিয়ে নিজের কাজেই মনোযোগী থাকার কথা জানিয়েছেন তিনি।
‘আমার নেতা’ গান ঘিরে বিতর্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী, সাবিলা নূর, জেফার রহমান ও সালমান মুক্তাদিরের কণ্ঠ নকল করে আপত্তিকর বক্তব্য সংযোজন করা হয়েছে। ভিডিওগুলোতে তাঁদের ছবি ও কণ্ঠ ব্যবহার করে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন তাঁরা নিজেরাই এসব কথা বলছেন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ‘আমার নেতা’ শিরোনামের একটি গানকে কেন্দ্র করে এসব ভিডিও তৈরি করা হয়। গানটি চলতি বছরের জানুয়ারিতে তানজ প্রোডাকশনসের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তারকাদের কণ্ঠ ক্লোন করে তৈরি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এ ঘটনায় তানজিম নূর ও সোহাগ সিদ্দিকীর নামও আলোচনায় এসেছে। গত ৮ অক্টোবর তাঁদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওগুলো ছড়ানোর কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে একাধিক পেজে একই ধরনের ভিডিও শেয়ার করা হয়।
তবে কোনো কনটেন্ট তৈরি বা প্রচারের সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও যথাযথ তদন্ত ছাড়া কারও দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
ডিপফেক শনাক্তে যেসব অসংগতি
ডিপফেক শনাক্তকারী বিভিন্ন টুলের মাধ্যমে ভিডিও ও অডিও বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ভিডিওগুলোর বিভিন্ন দৃশ্যে ঠোঁটের নড়াচড়া ও কণ্ঠস্বরের মধ্যে অসংগতি, মুখমণ্ডলের চারপাশে আলো-ছায়ার অস্বাভাবিকতা এবং মাথা ও ঘাড়ের নড়াচড়ায় অসামঞ্জস্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাসরিফ খানের কণ্ঠ ব্যবহার করে তৈরি গানটির অডিও পরীক্ষাতেও কণ্ঠ ক্লোনিংয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে কোনো একটি প্রযুক্তিগত লক্ষণ দেখেই ডিপফেকের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা যায় না। নির্ভরযোগ্য যাচাই, মূল কনটেন্টের সঙ্গে তুলনা এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ।
সচেতনতা ও যাচাইয়ের বিকল্প নেই
গবেষক ও ফ্যাক্টচেকার মিরাজ হোসেনের মতে, ভয়েস ক্লোনিং ও ডিপফেক মানুষের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিকে একসঙ্গে বিভ্রান্ত করতে পারে। ফলে প্রযুক্তি ও গণমাধ্যম সম্পর্কে সচেতনতা কম থাকা ব্যক্তিদের পক্ষে আসল-নকলের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। যাচাই ছাড়াই এসব কনটেন্ট শেয়ার করার কারণে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কোনো ভিডিও বা অডিও অস্বাভাবিক মনে হলে সেটিকে তাৎক্ষণিকভাবে সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। বক্তব্যের প্রেক্ষাপট, প্রকাশের উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এবং কনটেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করতে হবে। সন্দেহজনক কনটেন্ট শেয়ার না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিপোর্ট করা এবং প্রয়োজনে ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
ডিপফেকের শিকার হলে ভুক্তভোগীর উচিত সংশ্লিষ্ট কনটেন্টের লিংক, স্ক্রিনশট ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করা। পাশাপাশি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দেওয়া এবং প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
অনুমতি ছাড়া ছবি-কণ্ঠ ব্যবহারে আইনি প্রতিকার
বাংলাদেশ সাইবার পুলিশ সেন্টারের মিডিয়া সেলের শাফি উল্লাহর বক্তব্য অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া কারও ছবি, কণ্ঠ বা ভিডিও ক্লোন করে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হলে ভুক্তভোগী নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করতে পারেন।
স্থানীয় থানা তদন্তে সক্ষম না হলে সংশ্লিষ্ট মামলা পুলিশের বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট বা সিআইডিতে পাঠানো হতে পারে। তদন্তের ভিত্তিতে কনটেন্ট তৈরি, প্রচার কিংবা ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী মো. রিয়াজুর রহমান রায়হানের মতে, এআইয়ের সাহায্যে কারও ছবি বা কণ্ঠ ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর কিংবা সম্মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সুনামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ঘটনার ধরন ও প্রযোজ্য আইনের ওপর নির্ভর করে মানহানিসহ বিভিন্ন আইনি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
এআই প্রযুক্তি সৃজনশীল কাজের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর অপব্যবহার ব্যক্তির পরিচয়, সম্মান ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে পরিচিত ব্যক্তিদের ছবি ও কণ্ঠ ব্যবহার করে ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করা হলে তাঁদের সামাজিক মর্যাদা ও দর্শক-ভক্তদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংকট মোকাবিলায় আইনগত পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রয়োজন ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যকর নজরদারি এবং ভুক্তভোগীদের দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে যাচাই ছাড়া আপত্তিকর ভিডিও শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
কারও মুখ বা কণ্ঠ দেখা কিংবা শোনা গেলেই সেটিকে সত্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। ডিপফেকের যুগে তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীল আচরণ এবং ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রতি সম্মানই হতে পারে অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায়।
সন্ধানী বার্তা/জেএন