শৌচাগার ব্যবহারে কতক্ষণ সময় লাগছে, তা এবার বাইরে থেকেই দেখতে পাচ্ছেন অপেক্ষমাণ ব্যক্তিরা। চীনের একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে নারী শৌচাগারের প্রতিটি কক্ষের বাইরে বসানো হয়েছে ডিজিটাল টাইমার। কেউ কক্ষে প্রবেশ করলে ডিসপ্লেতে সময় গণনা শুরু হয়। আর কক্ষ খালি থাকলে দেখা যায় সবুজ সংকেত।
ব্যতিক্রমী এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে চীনের শানসি প্রদেশের দাতং শহরের ইউনগাং গুহামন্দির পর্যটন এলাকায়। ২০২৪ সালের ১ মে থেকে চালু হওয়া এ ব্যবস্থা নিয়ে ওই বছরের জুনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন এবং চীনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, পর্যটকদের চাপ সামলানো ও শৌচাগার ব্যবস্থাপনা উন্নত করার উদ্দেশ্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
কক্ষে ঢুকলেই শুরু হয় সময় গণনা
শৌচাগারের প্রতিটি কক্ষের দরজার ওপরে স্থাপন করা হয়েছে এলইডি ডিসপ্লে। কক্ষটি খালি থাকলে সবুজ সংকেত দেখা যায়। কেউ ভেতরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করলে ডিসপ্লেতে লাল সংকেতের পাশাপাশি মিনিট ও সেকেন্ডের হিসাবে সময় দেখানো হয়।
এতে বাইরে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিরা বুঝতে পারেন কোন কক্ষটি খালি, কোনটি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেখানে কতক্ষণ ধরে কেউ অবস্থান করছেন। ফলে অযথা দরজায় ধাক্কা দেওয়া বা খালি কক্ষ খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।
তবে এই টাইমার চালু হওয়ার পর অনেকের মনে প্রশ্ন ওঠে—নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলে কি ব্যবহারকারীকে বের হয়ে আসতে বাধ্য করা হবে?
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পর্যটনকেন্দ্রের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শৌচাগার ব্যবহারের সময় নিয়ন্ত্রণ করা এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নয়। পাঁচ বা দশ মিনিটের মতো কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়নি। সময় বেশি লাগলে কাউকে মাঝপথে বের করে দেওয়ার প্রশ্নও নেই।
নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো শৌচাগারের ভেতরে কেউ দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে বা অন্য কোনো সমস্যায় পড়লে দীর্ঘ সময় ধরে কক্ষে অবস্থানের বিষয়টি নজরে আসতে পারে।
অর্থাৎ, শুধু ভিড় ব্যবস্থাপনা নয়, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও এই প্রযুক্তি চালুর পেছনে বিবেচনায় ছিল বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে টাইমার কতক্ষণ ধরে চললে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়, কিংবা এ ব্যবস্থার সঙ্গে কোনো স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম যুক্ত আছে কি না—প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পর্যটকেরা দেখছেন সুবিধা ও অস্বস্তি—দুই দিকই
ডিজিটাল টাইমার নিয়ে পর্যটকদের প্রতিক্রিয়াও মিশ্র। কেউ মনে করছেন, এ ব্যবস্থায় কক্ষ খালি আছে কি না সহজে বোঝা যাবে এবং দীর্ঘ অপেক্ষার ভোগান্তি কমতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, শৌচাগার ব্যবহারের সময় প্রকাশ্যে দেখানো অস্বস্তিকর এবং এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এক পর্যটক স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রযুক্তিটি উন্নত মনে হলেও ডিসপ্লেতে ব্যবহারের সময় দেখানোর কারণে তাঁর নিজেকে পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকা ব্যক্তির মতো মনে হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, অতিরিক্ত শৌচাগার নির্মাণের পরিবর্তে এ ধরনের ব্যবস্থা কতটা প্রয়োজনীয়। অন্যদিকে, জরুরি পরিস্থিতিতে কারও খোঁজ নিতে এটি সহায়ক হতে পারে বলেও মত দিয়েছেন অনেকে।
বছরে ৩০ লাখের বেশি পর্যটকের গন্তব্য
চীনের অন্যতম ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র ইউনগাং গুহামন্দির। প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো এই স্থাপনায় রয়েছে অসংখ্য বৌদ্ধ ভাস্কর্য ও পাথরে খোদাই করা গুহা। ইউনেস্কো ২০০১ সালে স্থানটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
সিএনএনের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পর্যটনকেন্দ্রটিতে প্রায় ৩০ লাখ দর্শনার্থী গিয়েছিলেন। এর আগে ২০১৯ সালে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার। পর্যটকের এই উল্লেখযোগ্য চাপের কারণে শৌচাগারসহ দর্শনার্থীদের বিভিন্ন সুবিধা ব্যবস্থাপনায় নতুন উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়।
সব মিলিয়ে, শৌচাগারের বাইরে ডিজিটাল টাইমার স্থাপনের উদ্যোগটি প্রযুক্তিনির্ভর পর্যটন ব্যবস্থাপনার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তবে এ ধরনের ব্যবস্থায় নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ব্যবহারকারীর স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: সিএনএন, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট
সন্ধানী বার্তা/জেএন