আন্তর্জাতিক

তেলাপোকা দলেই কাঁপছে মোদি সরকার!

ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ আর উপহাসের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু। অথচ আত্মপ্রকাশের চার মাসও না পেরোতেই ভারতের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে নতুন দল—করোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির নাম নিয়ে কটাক্ষের মধ্যেই এবার তাদের বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড়ের অভিযোগ উঠেছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে অভিযোগের তদন্তের দাবিতে কর্মসূচি শুরুর আগেই দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকসহ নেতাকর্মীদের আটক করেছে পুলিশ। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রতিবাদ ঠেকাতে সরকারের এই পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

গত শনিবার (১০ অক্টোবর) মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর বিমান অবতরণ করতেই অভিজিৎকে আটক করা হয় বলে খবর। তাঁর সঙ্গে দলের দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকেও আটক করা হয়েছে। অভিজিতের অভিযোগ, ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার সময়ও এমন আচরণ দেখা যায়নি। তাঁর ভাষায়, ‘এটা একনায়কতন্ত্র—আমাদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে। আমরা গ্রেপ্তার হতেই এসেছি, আপনাদের ভয় পাই না।’

  • বিক্ষোভের আগেই বিমান থেকে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতাকে আটক
  • দিল্লিতে পাঁচ হাজারের বেশি ধরপাকড়ের অভিযোগ
  • জরুরি অবস্থার ছায়া দেখছে বিরোধীরা

বিক্ষোভের আগেই ধরপাকড়
দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর আগেই বহু বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ। _দ্য হিন্দু_-র বরাতে এক দিনে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে আটকের খবর সামনে এসেছে। আটক ব্যক্তিদের পুলিশ ভ্যানে তুলে ছত্রশাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়ার কথাও জানা গেছে।

সিজেপির অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। দলটি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং অভিযোগের তদন্ত দাবি করেছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করা জরুরি। একইভাবে, বিক্ষোভকারীদের আটক করার ক্ষেত্রে পুলিশের আইনি ভিত্তি ও পদক্ষেপের যৌক্তিকতাও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা
দিল্লির ধরপাকড়কে কেন্দ্র করে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ তুলেছেন বিরোধী নেতারা। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমান পরিস্থিতিকে জরুরি অবস্থার চেয়েও ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেছেন। যন্তর মন্তরে যেতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি দক্ষিণ অ্যাভিনিউ এলাকায় দলের সাংসদদের নিয়ে ধর্নায় বসেন। পরে তাঁকেসহ তৃণমূলের একাধিক নেতাকে আটক করা হয়েছে বলে খবর। সোমবার ইন্ডিয়া জোটের প্রস্তাবিত মিছিলে যোগ দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

আম আদমি পার্টির আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়ালও সিজেপি নেতাদের আটকের সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আটক করে তরুণদের প্রতিবাদ থামানো যাবে না। কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নও দিল্লিকে কার্যত ‘মুক্ত কারাগার’ বানানোর অভিযোগ তুলেছেন।

ভোটার তালিকা নিয়ে আস্থার প্রশ্ন
এই ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য শুধু একটি নতুন দলের বিক্ষোভ দমনের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। ভোটার তালিকা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভিত্তি। সেখানে নাম বাদ পড়া নিয়ে অভিযোগ উঠলে তার স্বচ্ছ তদন্ত এবং আপত্তি জানানোর কার্যকর সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া অনিয়মকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা বলা যায় না; আবার যথাযথ অনুসন্ধান ছাড়াই অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়াও যুক্তিসংগত নয়।

একইভাবে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও সরকারের সমালোচনা গণতান্ত্রিক অধিকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজন থাকলেও ব্যাপক আটক, বিশেষত কর্মসূচিতে পৌঁছানোর আগেই নেতাদের গ্রেপ্তারের অভিযোগ, প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। আটক ব্যক্তিদের সংখ্যা, আইনি কারণ এবং তাঁদের কোথায় রাখা হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।

সিজেপিকে ঘিরে উপহাস থেকে রাজনৈতিক উদ্বেগ—এই পরিবর্তনের পেছনে দলের প্রকৃত সাংগঠনিক শক্তি কতটা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে দিল্লির ঘটনাপ্রবাহ নতুন দলটির চেয়ে বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে: নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও নাগরিকের প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাব কি তদন্ত ও সংলাপের মাধ্যমে দেওয়া হবে, নাকি কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপই হয়ে উঠবে প্রধান প্রতিক্রিয়া?

সন্ধানী বার্তা/আরএ/এমকে


সম্পর্কিত খবর