আইন

সাক্ষীকে ‘ভয় পাইছে’ বললেন পলক, ট্রাইব্যুনালের ভর্ৎসনা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ পলকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) উপপরিচালক মাহদী আহমেদ। সাক্ষ্য দেওয়ার একপর্যায়ে তাঁকে উদ্দেশ করে পলক বলেন, ‘ভয় পাইছে, ভয় পাইছে।’ এ সময় পলককে কথা কম বলতে বলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

রোববার (১১ অক্টোবর) ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণের সময় এ ঘটনা ঘটে। মামলার আসামি জয় পলাতক থাকলেও পলক আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পলকের পক্ষে আইনজীবী লিটন আহমেদ এবং জয়ের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মনজুর আলম আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম।

  • জয়-পলকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিটিআরসির কর্মকর্তার সাক্ষ্য
  • ইন্টারনেট বন্ধ, আন্দোলন দমন ও হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ঘিরে বিচার

ইন্টারনেট চালুর বৈঠক নিয়ে আপত্তি
সাক্ষ্যের একপর্যায়ে ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের প্রসঙ্গ আসে। তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী পলকের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে থ্রি-জি ও ফোর-জি ইন্টারনেট সেবা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে সাক্ষ্যের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।

বক্তব্যের এ অংশ নিয়ে আপত্তি জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। তাঁদের যুক্তি, বিষয়টি মামলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। তাই ওই অংশ বাদ দেওয়ার আবেদন জানান তাঁরা। সাক্ষীও রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যে সম্মতি দেন। এ সময় সাক্ষীকে উদ্দেশ করে পলক বলেন, ‘ভয় পাইছে, ভয় পাইছে।’ তখন ট্রাইব্যুনাল তাঁকে বলেন, ‘একটু বসতে পারেন। কথা কম বলেন দয়া করে।’

পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে পলক বলেন, প্রসিকিউটর প্রশ্ন করে সাক্ষীর জবানবন্দি নিয়েছেন। তাই বক্তব্যের কোনো অংশ বাদ দিতে হলে সাক্ষীকে ‘হোস্টাইল’ করতে হবে। জবাবে মাহদী আহমেদ জানান, সারাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক এনটিএমসির নির্দেশনায় বন্ধ করা হয়েছিল—এমন বক্তব্য আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে। তবে সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে তিনি নিজে জানেন না। ২৮ জুলাইয়ের বৈঠকের মাধ্যমে ইন্টারনেট চালুর বিষয়টি জানতে পেরেছেন বলে জানান তিনি।

তিন অভিযোগে বিচার
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জয় ও পলকের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, জয়ের নির্দেশনা ও অনুমোদনে পলক ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনটি পোস্ট দেন। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, এসব পোস্ট আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে উসকানি সৃষ্টি করেছিল।

দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ও জয়ের নির্দেশ, অনুমোদন ও জ্ঞাতসারে পলক আন্দোলন দমনে ইন্টারনেটের গতি কমানো এবং ইন্টারনেট ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের উদ্যোগ নেন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এতে আন্দোলনকারীদের যোগাযোগ ব্যাহত হয় এবং তাঁদের শনাক্ত ও দমন করা সহজ হয়। একই অভিযোগে ১৯ জুলাই রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ২৬ জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় আসামিদের কথিত সংশ্লিষ্টতার বিষয়ও রয়েছে।

তৃতীয় অভিযোগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা এলাকায় শিশু জাবির ইব্রাহিমসহ ৩২ জনকে গুলি করে হত্যা এবং বহু মানুষকে আহত করার ঘটনায় জয় ও পলকের নির্দেশ, জ্ঞাতসার বা সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সারাদেশে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি আহত হন। এসব ঘটনায় জয় ও পলকের দায় রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও আসামিদের দায় নির্ধারিত হবে বিচারিক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে।

সন্ধানী বার্তা/এমএসআইপি/এমকে


সম্পর্কিত খবর