দেশজুড়ে

১৫ গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ, সংস্কার নেই তিন বছর

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর থেকে মৌলভীবাজারের আথানগিরি পর্যন্ত সড়ক যেন এখন পুকুরের সারি। কোথাও বড় গর্ত, কোথাও জমে আছে বৃষ্টির পানি, আবার কোথাও কাদায় একাকার পুরো রাস্তা। ঝুঁকি নিয়ে চলছে অটোরিকশা, ভোগান্তি পোহাচ্ছেন পথচারী ও শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটি দিয়ে চলাচল এখন রীতিমতো দুর্ভোগের নাম। দ্রুত সংস্কারের দাবি জানালেও বরাদ্দ না থাকায় কাজ শুরু করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রকৌশল বিভাগ।

নবীগঞ্জ উপজেলার দরগাপাড়ার বাসিন্দা ফারিয়া জান্নাত মনি। তিনি প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের দিনারপুর কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়েন। প্রতিদিন কলেজে যাতায়াতের জন্য তাঁকে গজনাইপুর-আথানগিরি সড়ক ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু সড়কের বেহাল দশার কারণে নির্ধারিত সময়ে যানবাহন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কখনও কখনও অটোরিকশার জন্য ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে হয় তাঁকে। অথচ স্বাভাবিক অবস্থায় ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে কলেজে পৌঁছানোর কথা।

সম্প্রতি সড়কটি পরিদর্শনের সময় ফারিয়া জান্নাত মনিকে হেঁটে কলেজে যেতে দেখা যায়। তিনি জানান, রাস্তার অবস্থা খারাপ হওয়ায় আগের মতো সহজে গাড়ি পাওয়া যায় না। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে সময় নষ্ট না করে হেঁটেই কলেজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এতে শারীরিক ক্লান্তি আসে, যার প্রভাব পড়ে ক্লাসে মনোযোগের ওপর। বিশেষ করে পরীক্ষার দিন নির্দিষ্ট সময়ে কেন্দ্রে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নবীগঞ্জ উপজেলার জনতার বাজার থেকে কাগাবলা, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আথানগিরি হয়ে সড়কটি পৌঁছেছে মৌলভীবাজার শহরে। নবীগঞ্জ ও মৌলভীবাজার সদরের অন্তত ১০ থেকে ১৫টি গ্রামের মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি।

কাগাবলা, আথানগিরি, নবীগঞ্জের শতক, তারালিয়া, লামরোহ, মাহমদপুর ও গজনাইপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল। সড়কের পাশে রয়েছে দিনারপুর উচ্চ বিদ্যালয়, দিনারপুর কলেজ, পানিউমদা রাগিব রাবিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং দিনারপুর মাদ্রাসা। ফলে প্রতিদিন শিক্ষার্থী ছাড়াও কর্মজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীদের চলাচল করতে হয় এই পথ দিয়ে।

কিন্তু সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। যানবাহন চলাচল কমে যাওয়ায় যাত্রীদের অপেক্ষার সময় বাড়ছে, আবার হেঁটে চলাচল করতেও পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সড়কটি সর্বশেষ পাকা করা হয়েছিল প্রায় ২০ বছর আগে। তিন বছর আগে একবার সংস্কারকাজ করা হলেও সড়কের কয়েকটি অংশের অবস্থা এখনও নাজুক। বিশেষ করে গজনাইপুর থেকে আথানগিরি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার অংশে যানবাহন চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত তিন বছর ধরে কার্যকর সংস্কার না হওয়ায় সড়কের বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। তাঁদের দাবি, নির্মাণের সময় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণেও সড়ক দ্রুত নষ্ট হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি সড়কের গজনাইপুর, জনতার বাজার, শতক বাজার, দরগাপাড়া, কামারগাঁও ও আথানগিরি এলাকায় অসংখ্য গর্ত দেখা গেছে। বৃষ্টির পানি জমে সেগুলো পরিণত হয়েছে কাদাপূর্ণ গর্তে। কোথায় কতটা গভীর গর্ত, তা বোঝা কঠিন হওয়ায় চালকদের সতর্কভাবে যানবাহন চালাতে হচ্ছে।

সড়কের দুরবস্থায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। দিনারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার জানায়, রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে প্রতিদিন স্কুলে যেতে ইচ্ছা করে না। এখন নিয়মিত বৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই গর্তে পানি ও ময়লা জমে যায়। এতে চলাচলের সময় পোশাক নোংরা হয়ে যায়, ভোগান্তিতে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, খানাখন্দের কারণে প্রায়ই অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ছে। কোথাও রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদেরও বিপদে পড়তে হচ্ছে। দ্রুতগতির যানবাহন এলে কিংবা অন্য গাড়িকে পাশ কাটাতে গেলে চালকদের বেকায়দায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, আর সড়কটি দিয়ে যান চলাচলও আগের তুলনায় কমেছে।

জনতার বাজারের সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক হেলাল মিয়া সড়কের অবস্থা বোঝাতে গিয়ে আক্ষেপ করে বলেন, ‘এটি সড়ক নয় তো, যেন পুকুর। কোথাও কোথাও ধান রোপণ করা লাগবে। একটা গাড়ি চলার উপায় নেই। বৃষ্টি হলে পানি জমে, মাছও চাষ করা যাবে!’

তাঁর এই মন্তব্যে উঠে এসেছে সড়কটির বর্তমান চিত্র। বৃষ্টির পর গর্তে পানি জমে থাকায় যানবাহন চালাতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। যাত্রী নিয়ে চলাচলের সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে। এতে চালকদের যেমন সময় ও শ্রম বেশি ব্যয় হচ্ছে, তেমনি যাত্রীদেরও ভোগান্তি বাড়ছে।

শতক গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুর রশিদ জানান, আগে থেকেই সড়কটির অবস্থা খারাপ ছিল। গত তিন থেকে চার বছরে বেশির ভাগ অংশের কার্পেটিং উঠে গিয়ে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। এতে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছে।

তিনি আরও জানান, খানাখন্দের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। কোনো দ্রুতগতির যানবাহন সড়কে ঢুকলে অন্য গাড়িকে পাশ কাটানোর সময় চালককে বিপাকে পড়তে হয়। এ কারণে আগের তুলনায় যান চলাচল অনেকটা কমে গেছে।

সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকার কারণে জনদুর্ভোগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন নবীগঞ্জ উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মীর সাব্বির আহমদ।

গত সোমবার তিনি সমকালকে জানান, বরাদ্দ না পাওয়ায় সড়কটির সংস্কারকাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। গত জুনে বিষয়টি জানিয়ে ঢাকায় চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সেই চিঠির কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। সড়কটির বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইলে তিনি নথি দেখে জানাতে হবে বলে উল্লেখ করেন। তবে সর্বশেষ তিন বছর আগে সড়কটিতে সংস্কারকাজ হয়েছিল বলে জানান তিনি।

গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের বেহাল দশায় একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনেও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মস্থলে যাতায়াত এবং মৌলভীবাজার শহরের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের।

বর্ষা এলেই গর্তে পানি জমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। তাই শুধু সাময়িক মেরামত নয়, সড়কটির টেকসই সংস্কার চান এলাকাবাসী। তাঁদের প্রত্যাশা, বরাদ্দের জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু হবে এবং দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাবেন অন্তত ১০ থেকে ১৫ গ্রামের মানুষ।

সন্ধানী বার্তা/এসকে/এমএসআইপি


সম্পর্কিত খবর