বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কাছে ৭-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে হার। তার ওপর জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের ভ্রমণ বিড়ম্বনা, গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারদের দলে না পাওয়া এবং ফেডারেশনের অব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা। সব মিলিয়ে বড় সংকটে পড়েছে আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর ফুটবল। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের নিয়ন্ত্রণ সরাসরি নিজের হাতে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ও সামরিক নেতা ইব্রাহিম ত্রাওরে। তবে সরকারের এমন হস্তক্ষেপে আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে দেশটি।
৭ গোলের হারেই সামনে এলো ফুটবলের অন্দরমহলের সংকট
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বুরকিনা ফাসোর ৭-০ গোলের পরাজয় কেবল মাঠের ফলাফলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই হার ঘিরে দেশটির জাতীয় ফুটবল দলের প্রস্তুতি, ব্যবস্থাপনা ও ফেডারেশনের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো মৌলিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতেও ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বুয়েনস এইরেসে ম্যাচের আগে বুরকিনা ফাসোর খেলোয়াড়দের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ট্রানজিট ভিসার জটিলতা এবং ঘুরপথে বিমানযাত্রার কারণে কয়েক দিন ধরে ভোগান্তিতে পড়েন তারা। ম্যাচ শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে গন্তব্যে পৌঁছানোয় খেলোয়াড়দের পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারদের ছাড়াই মাঠে নামতে হয় দলকে
দলের দুর্বল প্রস্তুতির অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে বিদেশি লিগে খেলা কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারকে দলে অন্তর্ভুক্ত করতে না পারার ঘটনায়। জাতীয় দলের জন্য প্রয়োজনীয় খেলোয়াড়দের একত্র করা এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে যথাযথ প্রস্তুতি নিশ্চিত করা ফেডারেশনের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু সেই ব্যবস্থাপনাতেই ঘাটতি থাকার অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিস্থিতির জন্য বুরকিনা ফাসো ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কর্নেল-মেজর উমারু সাওয়াদোগোর নেতৃত্বের দিকে আঙুল তুলেছেন সমালোচকেরা। তাদের অভিযোগ, জাতীয় দলের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থতার কারণে মাঠের পারফরম্যান্সেও তার প্রভাব পড়েছে।
তবে আর্জেন্টিনার কাছে বড় ব্যবধানে হারকে ঘিরে ওঠা সব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনের বক্তব্য ছাড়া পুরো ব্যর্থতার দায় এককভাবে নির্ধারণ করা কঠিন।
‘আমাদের ফুটবল অসুস্থ’, ক্ষোভ প্রেসিডেন্টের
ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম আরএমসি স্পোর্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় দলের এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম ত্রাওরে। তার মতে, নতুন করে অর্থ বিনিয়োগের আগে ফুটবলের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান জরুরি।
ত্রাওরে বলেন, ‘এটি অনস্বীকার্য সত্য যে আমাদের ফুটবল আজ মারাত্মক অসুস্থ। যেকোনো উপায়ে আমাদের এর সঠিক প্রতিকার খুঁজে বের করতে হবে। নতুন করে অর্থ বিনিয়োগ করার আগে এই জাতীয় রোগ সারাতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চলতি সপ্তাহেই আমাদের বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যে স্পষ্ট, জাতীয় দলের সাম্প্রতিক ব্যর্থতাকে তিনি শুধু মাঠের ফলাফল হিসেবে দেখছেন না; বরং এর পেছনে থাকা প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনারও পরিবর্তন চান।
ফেডারেশনকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার হুঁশিয়ারি
সংকটের কেন্দ্রে থাকা ফুটবল ফেডারেশনের নেতৃত্বকে এবার সরাসরি সতর্ক করেছেন ত্রাওরে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এতদিন ফেডারেশনের স্বাধীন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার আর নীরব থাকতে চায় না।
তিনি বলেন, ‘শেষবার আমি ফেডারেশন সভাপতিকে বলেছিলাম, এতদিন পর্যন্ত আমরা আপনাদের স্বাধীন কাজে কোনো হস্তক্ষেপ করতে চাইনি। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের হাত বাঁধা পড়ে গেছে।’
এরপর আরও কঠোর অবস্থান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ফিফা আমাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করুক কিংবা না করুক—আমাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ করতেই হবে। আমরা যখন হস্তক্ষেপ করব, তখন সবকিছু নতুন করে গুছিয়ে সঠিকভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যেই তা করব।’
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ফেডারেশনের প্রশাসনিক কাঠামোয় সরকারি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা সামনে এসেছে। তবে সরকার বাস্তবে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সরকারের হস্তক্ষেপে ফিফার নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি
বুরকিনা ফাসোর জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেশটির অবস্থান। ফিফার বিধি অনুযায়ী, সদস্য ফেডারেশনগুলোকে নিজেদের প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে হয়। সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নির্বাচিত নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া বা ফেডারেশনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট দেশ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়তে পারে।
ফিফার সংবিধানের ১৪ ও ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে সদস্য সংস্থার দায়িত্ব এবং তাদের স্বাধীন কার্যক্রমের বিষয়গুলো নির্ধারিত রয়েছে। কোনো ফেডারেশনের কার্যক্রমে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠলে ফিফা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না; সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি ও বিধি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর আগে কেনিয়া ও জিম্বাবুয়ের ফুটবল প্রশাসনে সরকারি হস্তক্ষেপের ঘটনায় ফিফা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। ফলে বুরকিনা ফাসোর ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেশটির অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
নিষেধাজ্ঞা এলে কী হারাতে পারে বুরকিনা ফাসো?
ফিফার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে জাতীয় দলের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং দেশের ফুটবল উন্নয়ন কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের মতো প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের (কাফ) অধীন ক্লাব প্রতিযোগিতায় দেশটির ক্লাবগুলোর অংশগ্রহণও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এ ছাড়া ফিফার ‘ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচির আওতায় ফুটবল উন্নয়নের জন্য দেওয়া অর্থায়ন ও অনুদানেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দেশের ফুটবল অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা।
তবে এসব পরিণতি নির্ভর করবে ফিফা কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয় কি না, দিলে তার ধরন কী হয় এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের পরিধি কতটা বিস্তৃত হয় তার ওপর।
৭ গোলের হার, নাকি পরিবর্তনের সূচনা?
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বড় ব্যবধানে পরাজয় বুরকিনা ফাসোর ফুটবল প্রশাসনকে ঘিরে জমে থাকা অসন্তোষকে সামনে নিয়ে এসেছে। খেলোয়াড়দের ভ্রমণসংকট, গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারদের অনুপস্থিতি এবং ফেডারেশনের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন—সবকিছু মিলিয়ে দেশটির ফুটবল এখন কঠিন এক সন্ধিক্ষণে।
প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম ত্রাওরে প্রশাসনিক পরিবর্তনের হুঁশিয়ারি দিলেও সেই পরিবর্তন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সমস্যার সমাধানে নেওয়া পদক্ষেপের ওপর। একই সঙ্গে ফিফার স্বাধীনতা-সংক্রান্ত বিধি অমান্য না করে সংকট মোকাবিলা করাও দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এখন দেখার বিষয়, আর্জেন্টিনার কাছে ৭ গোলের হার বুরকিনা ফাসোর ফুটবলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের সূচনা করে, নাকি সরকারি হস্তক্ষেপের জেরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আরও বড় সংকটে পড়ে দেশটি।
সন্ধানী বার্তা/জেএন