এক্সক্লুসিভ

মাধ্যমিকেই শেষ শিক্ষার দৌড়

এসএসসি পাস করলেই শিক্ষার পথ খুলে যাওয়ার কথা। বাস্তবতা বলছে উল্টো কথা। চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৮০ জন পাস করলেও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে ৯ লাখ ৫৭ হাজার ১১১ জন। অর্থাৎ পাস করেও ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬৯ জন শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকের পথে পা বাড়ায়নি। এর সঙ্গে এসএসসির আগেই ঝরে পড়াদের হিসাব যোগ করলে চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক।

দুই বছর আগে নবম শ্রেণিতে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিল ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ জন। অথচ এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন। অর্থাৎ নবম শ্রেণির নিবন্ধন থেকে এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত আসতেই ঝরে গেছে প্রায় সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী। পরীক্ষা না দেওয়া, ফেল করা এবং পাস করেও একাদশে না যাওয়াদের হিসাব একসঙ্গে ধরলে মাধ্যমিকের গণ্ডিতেই হারিয়ে যাচ্ছে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী।

  • পাস করেও থেমে গেল ১ লাখ ৮৭ হাজার
  • এসএসসির আগেই ঝরে সাড়ে চার লাখ
  • মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোয় না অর্ধেকের কাছাকাছি
  • একদিকে ২৬ লাখ আসন খালি

টাকার অভাবে থেমে যাচ্ছে পড়াশোনা
এই ঝরে পড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় আঘাত অর্থনৈতিক। এডুকেশন ওয়াচের গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতায় থাকা শিক্ষার্থীদের ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ মাধ্যমিক পর্যায়েই ঝরে পড়ছে। পরিবারের আয় কম, অথচ শিক্ষার খরচ বাড়ছে—এই দুইয়ের চাপে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের বড় একটি অংশ পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না।

শুধু বিদ্যালয়ের ভর্তি ফি বা বেতন নয়; বই-খাতা, পোশাক, যাতায়াত, পরীক্ষা ও আনুষঙ্গিক খরচের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিং ও গাইডের ব্যয়। ফলে শিক্ষার আনুষ্ঠানিক খরচের বাইরে একটি বড় ব্যয় পরিবারকে বহন করতে হচ্ছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে একজন প্রাথমিক শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় পরিবারের ব্যয় বেড়েছিল ২৫ শতাংশ। মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ছিল ৫১ শতাংশ। একাধিক সন্তান থাকা পরিবারে চাপটি আরও তীব্র।

বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রমেও হারাচ্ছে শিক্ষার্থী
অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রম। পড়াশোনায় অনীহা, পারিবারিক কাজে যুক্ত হওয়া, ভাষাগত সমস্যা এবং বিদ্যালয়ে যাতায়াতের নিরাপত্তাহীনতাও শিক্ষার্থীদের স্কুল ছাড়ার কারণ। অঞ্চলভেদে এসব কারণের গুরুত্বও ভিন্ন। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে এখনও শিক্ষার ধারাবাহিকতার বড় বাধা। গত বছর ফরম পূরণ করেও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া শিক্ষার্থীদের তথ্য যাচাইয়ে বাল্যবিয়ের বিষয়টি সামনে এসেছিল। অর্থাৎ অনেক শিক্ষার্থী স্কুল ছাড়ছে নিজের সিদ্ধান্তে নয়; পরিবারের আর্থিক বাস্তবতা, সামাজিক চাপ কিংবা নিরাপত্তাহীনতা তাকে সেই পথে ঠেলে দিচ্ছে।

আসন আছে ২৬ লাখ, শিক্ষার্থী কোথায়?
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে একাদশ শ্রেণির ভর্তি প্রক্রিয়ায়। আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাদশ শ্রেণিতে আসন রয়েছে ২৬ লাখের বেশি। বিপরীতে আবেদন করেছে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থী।

দ্বিতীয় ধাপের ফলাফলে ৫ হাজার ১২৯ জন আবেদনকারী কোনো কলেজে বরাদ্দ পায়নি। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী ৩২১ জন। অথচ বিপুলসংখ্যক আসন এখনও খালি। ১২টি কলেজে কোনো আবেদনই পড়েনি। আবার ৪১৬টি কলেজে আবেদন পড়লেও কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। একদিকে আসন খালি, অন্যদিকে কলেজহীন শিক্ষার্থী—এই বৈপরীত্য শুধু ভর্তি ব্যবস্থার সমস্যা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের পছন্দ, প্রতিষ্ঠানের মান এবং সুযোগের অসম বণ্টনেরও প্রতিচ্ছবি।

ভালো কলেজে ভিড়, অন্যগুলোতে শূন্যতা
বোর্ডভিত্তিক পরিসংখ্যানেও চিত্রটি স্পষ্ট। ঢাকা বোর্ডে ৩ লাখ ৫ হাজার ৫৮৭ জন আবেদনকারীর মধ্যে নির্বাচিত হয়েছে ২ লাখ ৭১ হাজার ৭৪৩ জন। রাজশাহী বোর্ডে ১ লাখ ২৯ হাজার ৩৪১ জন আবেদনকারীর মধ্যে নির্বাচিত হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৪৮৬ জন। কুমিল্লা, দিনাজপুর ও যশোর বোর্ডেও আবেদনকারী ও নির্বাচিতের সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে।

বিভাগভিত্তিক হিসাব আরও তাৎপর্যপূর্ণ। মানবিক বিভাগে ৯ লাখ ৯৭ হাজার ৪২৪টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেছে ৫ লাখ ৯২ হাজার ১০৫ জন। বিজ্ঞানে ৬ লাখ ২৭ হাজার ১০২টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৪২ জন। ব্যবসায় শিক্ষায় ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৯১৮টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬৭ জন।

অর্থাৎ দেশে শিক্ষার্থীর তুলনায় আসনের ঘাটতি নেই। সংকট হচ্ছে শিক্ষার্থীকে শিক্ষায় ধরে রাখা এবং বিদ্যমান আসনের সঙ্গে তার চাহিদার কার্যকর সমন্বয় করা। নির্দিষ্ট কিছু কলেজে শিক্ষার্থীর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে বহু প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ছে।

অগ্রগতি আছে, কিন্তু ঝুঁকিও বাড়ছে
গত দেড় দশকে মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার হার কমেছে। বিনামূল্যের পাঠ্যবই, উপবৃত্তি, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি, শিক্ষক নিয়োগ এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বেড়েছে। এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে আনা গেলেও শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা যাচ্ছে না সবার ক্ষেত্রে।

শিক্ষাবিদদের মতে, উপবৃত্তির অর্থ বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত করতে হবে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজন লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা। বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রম প্রতিরোধেও শিক্ষা বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, পরিবার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে কলেজগুলোর মানোন্নয়ন এবং ভর্তি ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের পছন্দের কেন্দ্রীভবন কমানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।

কারণ শিক্ষার্থী স্কুলে ঢুকছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত থাকছে না; পাস করছে, কিন্তু পরের ধাপে যাচ্ছে না। আবার উচ্চমাধ্যমিকে যাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ পছন্দের কলেজও পাচ্ছে না। তাই প্রশ্নটা এখন শুধু কতজন পাস করল, তা নয়। কতজনকে শিক্ষার ধারায় ধরে রাখা গেল—সেই হিসাবও কি এখন থেকে শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্যের মাপকাঠি হবে?

সন্ধানী বার্তা/টিইকে/এমকে


সম্পর্কিত খবর