অর্থনীতি

ব্যাংকে মুনাফা, তবু লোকসানের পাহাড়

ব্যাংক খাতের হিসাবের খাতায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। একদিকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা ৭৮৯ কোটি টাকা, অন্যদিকে সব হিসাব-নিকাশ শেষে নিট ক্ষতি ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি এখন পুঞ্জীভূত লোকসানে। এসব ব্যাংকের মোট পুঞ্জীভূত লোকসান ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ব্যাংক খাতের এই চিত্র। রোববার (৪ অক্টোবর) কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।

  • ৬১টির ২২ ব্যাংক পুঞ্জীভূত লোকসানে
  • ক্ষতির পরিমাণ ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা
  • খেলাপি ঋণ ছাড়িয়েছে ৬ লাখ কোটি

মুনাফা কোথায় মিলিয়ে যাচ্ছে
ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা মূলত ঋণ ও বিনিয়োগ থেকে আয় এবং পরিচালন ব্যয়ের পার্থক্য। কিন্তু খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হয়, মূলধন ঘাটতি পূরণে চাপ থাকে এবং দুর্বল সম্পদের কারণে বাড়ে আর্থিক ঝুঁকি। এসব সমন্বয়ের পরই অনেক ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা নিট লোকসানে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য, উচ্চ শ্রেণিকৃত ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ, মূলধন ঘাটতি ও দুর্বল সম্পদমান ব্যাংকগুলোর আয়ক্ষমতাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু আয় কম হওয়ার নয়; ব্যাংকগুলোর আগের অনিয়ম ও দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনার দায়ও এখন বর্তমান আর্থিক ফলাফলে এসে পড়ছে।

২২ ব্যাংকের লোকসান

লোকসানে থাকা ২২ ব্যাংকের মধ্যে চারটি রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক—জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক। বিশেষায়িত ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকও রয়েছে এই তালিকায়। বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে লোকসানে আছে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। বেসরকারি খাতের ১৫ ব্যাংকও একই চাপে রয়েছে। ফলে সংকটটি কোনো একটি শ্রেণির ব্যাংকে আটকে নেই; সরকারি, বেসরকারি, বিশেষায়িত ও বিদেশি—সব ধরনের ব্যাংকেই এর ছাপ রয়েছে। অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার মনে করেন, আগের সময়ে তৈরি হওয়া অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রভাব এখনো কাটেনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেই সমস্যার ফলই বর্তমান লোকসান।

খেলাপি ঋণে বড় ধাক্কা

ব্যাংক খাতের দুর্বলতার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন খেলাপি ঋণে। ৩০ জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা নিয়মিতভাবে ফেরত আসছে না।

এতে ব্যাংকের নগদ প্রবাহে চাপ তৈরি হচ্ছে, আয় কমছে এবং খেলাপির বিপরীতে বিপুল অর্থ প্রভিশন হিসেবে আটকে রাখতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, একদিকে এক-তৃতীয়াংশ ঋণ খেলাপি, অন্যদিকে এক-তৃতীয়াংশের বেশি ব্যাংক লোকসানে—দুটি প্রবণতাই ব্যাংক খাতের দুর্বলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত।

দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে ৮৫ হাজার কোটি

তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার চাপও বেড়েছে। ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২টি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা নিয়েছে। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ১৭ হাজার কোটি, এক্সিম ব্যাংক ১২ হাজার ১০ কোটি এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। এ ধরনের সহায়তা তাৎক্ষণিক নগদ সংকট সামাল দিতে পারে। কিন্তু মূল সমস্যা যদি হয় খেলাপি ঋণ, দুর্বল সম্পদ ও মূলধন ঘাটতি, তাহলে কেবল তারল্য জোগান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য ফেরানো কঠিন।

সামনে সংস্কারের কঠিন পরীক্ষা

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর প্রস্তাবও এসেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি কি না, সে প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে সংখ্যা কমানোই একমাত্র সমাধান নয়। ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ বন্ধ, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা, পরিচালনা পর্ষদে জবাবদিহি এবং ব্যাংকের মূলধন কাঠামো শক্তিশালী করা—সবকিছুকেই একই সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।

কারণ, ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসান কিংবা ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ কোনো এক বছরের সমস্যা নয়। এগুলো দীর্ঘদিনের দুর্বলতা জমে ওঠার ফল। এখন ব্যাংক খাতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু লোকসানি প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখা নয়; বরং কেন বারবার এমন সংকট তৈরি হচ্ছে, সেই মূল কারণ দূর করা।

সন্ধানী বার্তা/এমএইচ/এমকে


সম্পর্কিত খবর