প্রধান প্রতিবেদন

সকালে স্কুলে, বিকেলে টিউশনি—বেতনহীন শিক্ষকের সংসার

সকাল হলেই গ্রামের মেঠোপথ ধরে স্কুলের দিকে হাঁটেন শিক্ষক মো. রুহুল আমিন। হাতে বই-খাতা। সামনে তাঁর প্রতিদিনের পরিচিত শ্রেণিকক্ষ। সেখানে ঢুকেই শুরু হয় পড়ানো। শিক্ষার্থীদের কেউ বই খুলে বসে, কেউ খাতা বের করে। রুহুল আমিনও অন্য দিনের মতো বোর্ডে লিখতে থাকেন। ক্লাস শেষ হয়। শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফেরে। কিন্তু রুহুল আমিনের দিনের কাজ তখনো শেষ হয় না।

সংসার চালাতে তাঁকে বিকেলে প্রাইভেট পড়াতে হয়। কখনো যেতে হয় মাঠে। চাষাবাদ করতে হয়। কারণ যে চাকরিটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়, সেই চাকরি থেকে মাস শেষে নিয়মিত বেতন আসে না। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সোনাইডাঙ্গা বৈকণ্ঠপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষক ২০০২ সাল থেকে সেখানে চাকরি করছেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন। কিন্তু এখনো প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হয়নি।

  • প্রায় ৪০ হাজার নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীর জীবনে অনিশ্চয়তা
  • ২০-২৬ বছর ধরে একই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান
  • অথচ মাস শেষে বেতন নেই
  • সংসার টানতে কেউ পড়ান প্রাইভেট, কেউ চাষ করেন, কেউ বসেন দোকানে

রুহুল আমিনের সংসারের গল্পটিও খুব সাধারণ—অথচ কষ্টের। স্কুল থেকে সামান্য যে টাকা পান, তা দিয়ে বাজার-সদাই, সন্তানের পড়াশোনা, পোশাক, চিকিৎসা—সব সামলানো সম্ভব নয়। তাই শিক্ষকতার পাশাপাশি তাঁকে অন্য কাজ করতে হয়। সন্তানের কোনো আবদার পূরণ করতে না পারার কষ্টটা হয়তো একজন বাবার কাছে সবচেয়ে বেশি। রুহুল আমিনের জীবনেও সেই কষ্ট আছে।

যশোর সদরের রূপদিয়ো বালিকা দাখিল মাদরাসার সুপার শরীফুল ইসলামের জীবনেও একই দৃশ্য। ২০০১ সালে মাদরাসায় যোগ দিয়েছিলেন। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি স্বীকৃতি পেয়েছে। চাকরির বয়স এখন ২৬ বছর। এতটা সময় ধরে একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সামলানোর পরও সরকারি বেতন-ভাতার তালিকায় তাঁর নাম নেই। অবসরের সময় ঘনিয়ে এসেছে। অথচ যে চাকরিতে জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়টা কাটালেন, সেখান থেকে নিয়মিত আর্থিক নিরাপত্তা পেলেন না। তাঁর প্রশ্নটা খুব সরল—আর কত দিন চাকরি করলে একজন শিক্ষক বেতন পাবেন? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু শরীফুল ইসলামের দরকার নয়। দেশের হাজারো নন-এমপিও শিক্ষক একই উত্তর খুঁজছেন।

শিক্ষক আছেন—শুধু বেতন নেই

দেশে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রায় সাড়ে তিন হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। তাঁদের কর্মদিবসও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মতোই। সকালে স্কুলে যেতে হয়। ক্লাস নিতে হয়। পরীক্ষার খাতা দেখতে হয়। শিক্ষার্থীদের ফলাফল তৈরি করতে হয়। প্রতিষ্ঠান থেকে দায়িত্ব দিলে সভায় বসতে হয়, বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ করতে হয়। কাজের জায়গায় খুব একটা পার্থক্য নেই। পার্থক্য তৈরি হয় মাসের শেষে। কেউ বেতন নিয়ে বাড়ি ফেরেন। আর কেউ হিসাব করেন—আগামী মাসটা কীভাবে চলবে। এই বাস্তবতায় অনেক শিক্ষক বিকেলে টিউশনি করেন। কেউ কৃষিকাজে যুক্ত হন। কেউ দোকান চালান। অর্থাৎ শিক্ষকতার আয় দিয়ে সংসার না চলায় তাঁদের নিজেদের শ্রমের আরেকটি বাজার খুঁজতে হয়।

একই যোগ্যতা, ভিন্ন ভাগ্য

নন-এমপিও শিক্ষকদের বঞ্চনার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত ১৬ বছরে বিভিন্ন সময়ে নীতিমালার বাইরে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। সংসদ সদস্যদের ডিও লেটারের প্রভাবেও কিছু প্রতিষ্ঠান এমপিও পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে একই ধরনের দুটি প্রতিষ্ঠানের ভাগ্যও ভিন্ন হয়েছে। একটিতে শিক্ষক মাস শেষে বেতন পান।

অন্যটিতে, একই দায়িত্ব পালন করা শিক্ষক বাড়ি ফেরেন খালি হাতে। কেন এমন হবে—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন এমপিও ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠিত কিছু প্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে এমপিও থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক দুই দশকের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছেন।

যোগ্যতা প্রমাণের পরও শেষ হয়নি অপেক্ষা

গত বছরের ১৪ থেকে ২৫ জানুয়ারি এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে আবেদন পড়ে ৩ হাজার ৬১৫টি। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৭১৯টি প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য বিবেচনা করা হয়। কাগজে-কলমে যোগ্যতা প্রমাণের পরও প্রতিষ্ঠানগুলোর অপেক্ষা শেষ হয়নি। এখন সেই তালিকা আবার যাচাই হতে পারে। পাশাপাশি নতুন আবেদনও নেওয়া হবে। ফলে যাঁরা এত দিন ধরে একটি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁদের সামনে আবারও অপেক্ষার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এমপিওভুক্তির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। শিগগির নতুন আবেদন নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। এবার সেই ঘোষণা বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনে, সেটিই দেখার বিষয়।

কলেজের বেতনে চলে না সংসার

শুধু স্কুল বা মাদরাসা নয়, বেসরকারি কলেজের অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষকরাও দীর্ঘদিন ধরে একই সংকট বয়ে বেড়াচ্ছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে ১৯৯৩ সাল থেকে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। কিন্তু এসব কোর্সে কর্মরত প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক এখনো এমপিও সুবিধার বাইরে।

একই কলেজের পাশের কক্ষে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন। তিনিও ক্লাস নিচ্ছেন। শিক্ষার্থীরাও একই। দায়িত্বও প্রায় একই। কিন্তু মাস শেষে একজনের হাতে নিয়মিত বেতন আসে, অন্যজন কলেজ থেকে পাওয়া অনিয়মিত সামান্য অর্থের ওপর নির্ভর করেন। কারও চাকরির বয়স ১৫ বছর। কারও ২০ বছর। কারও ক্ষেত্রে তিন দশকের কাছাকাছি। তবু বেতন কাঠামোয় তাঁদের স্থায়ী জায়গা হয়নি।

ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকদের গল্প

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকদের গল্প আরও পুরোনো। ১৯৮৪ সালে যাত্রা শুরু করা এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক এখনো নিয়মিত সরকারি সুবিধার বাইরে। একই সময়ের রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সরকারি হয়েছে। কিন্তু স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার বড় অংশের শিক্ষক সেই সুবিধা পাননি।

গত বছরের ৩ থেকে ১০ জুলাই এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন নেওয়া হয়েছিল। এরপর কেটে গেছে প্রায় এক বছর। কিন্তু এখনো কোনো স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা এমপিওভুক্ত হয়নি। অর্থাৎ আবেদনপত্র জমা হয়েছে। ফাইল গেছে। অপেক্ষা হয়েছে। কিন্তু অপেক্ষার শেষ দেখা যায়নি।

এমপিও পেলেও স্বস্তি নেই

বেসরকারি শিক্ষকদের সংকট এমপিওভুক্তির পরও পুরোপুরি শেষ হয় না। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতায় তাঁরা সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় পিছিয়ে। চিকিৎসা ভাতা মাত্র ৫০০ টাকা। উৎসব ভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ। বাড়িভাড়াও দীর্ঘদিন ছিল খুবই কম। আগামী জুলাই থেকে বাড়িভাড়া মূল বেতনের ১৫ শতাংশ করার কথা রয়েছে। ফলে একজন শিক্ষক এমপিওভুক্ত হওয়ার পরও সংসারের বাজার, সন্তানের পড়াশোনা, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসার খরচ সামলাতে হিমশিম খান।

৭০০ কোটি টাকার প্রশ্ন, ৪০ হাজার পরিবারের ভবিষ্যৎ

শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট দেশের ৩০ হাজার ৭৮৩টি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা জাতীয়করণের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির হিসাবে, জাতীয়করণে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা। বিপরীতে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সম্ভাব্য আয় হবে প্রায় ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি থাকবে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। সরকারের জন্য ৭০০ কোটি টাকার হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ৪০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর জীবনে অনিশ্চয়তার মূল্যও কম নয়।

কারণ একজন শিক্ষক যখন সকালে ক্লাস নেন, দুপুরে বাড়ি ফেরেন, বিকেলে টিউশনি পড়ান কিংবা জমিতে কাজ করেন—তখন তিনি শুধু নিজের সংসার চালানোর চেষ্টা করেন না; একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলে দেন একটি ব্যবস্থার সামনে। যে মানুষটি প্রতিদিন অন্যের সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ছেন, তাঁর নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ কেন অনিশ্চিত থাকবে?

যে শিক্ষক ২০ বছর ধরে শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর ২০ বছরের শ্রমের মূল্য কি শুধু ‘অপেক্ষা’ হতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত নন-এমপিও শিক্ষকদের সংকট শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা হয়ে থাকবে না। এটি থেকে যাবে হাজারো পরিবারের রান্নাঘর, সন্তানের স্কুলব্যাগ, চিকিৎসার প্রেসক্রিপশন আর মাসের শেষের খালি পকেটের গল্প হয়ে।

কালের আলো/টিইকে/এমকে


সম্পর্কিত খবর