আন্তর্জাতিক

ডলারেও ঠেকছে না ট্রাম্পের পতন

ভোটারদের হাতে অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, বয়স্কদের জন্য স্বাস্থ্যসুবিধা এবং অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর নানা ঘোষণা—সবই আছে। নেই শুধু কাঙ্ক্ষিত জনসমর্থন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার প্রবণতা থামাতে পারছে না এসব উদ্যোগ। বরং ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম, কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যবিরোধ, ইউরোপের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় তাঁর প্রশাসনের প্রতি আমেরিকানদের আস্থার সংকট আরও গভীর হচ্ছে।

আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন তাই শুধু কংগ্রেসের কয়েকটি আসনের লড়াই নয়; ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক শক্তিরও বড় পরীক্ষা। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে রিপাবলিকান পার্টি। তাতে ট্রাম্প প্রশাসনের বাজেট, আইন প্রণয়ন, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ এবং যুদ্ধনীতিতে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ ও চাপ বহুগুণ বাড়বে।

  • ৫ হাজার ডলারের প্রতিশ্রুতি, স্বাস্থ্যসেবার ঘোষণা
  • তবু ফিরছে না আস্থা
  • যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে ৩ নভেম্বরের ভোটে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা

টাকা দিয়েও কেন ফিরছে না ভোটারের মন

নির্বাচনের আগে ভোটারদের মন জয়ের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন অর্থনৈতিক সুবিধার একাধিক ঘোষণা সামনে আনছে। ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনে ট্রাম্প বলেছেন, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫ হাজার ডলার করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এরপর গত ২ অক্টোবর আরও একটি প্রতিশ্রুতি সামনে আসে। প্রায় দুই কোটি বয়স্ক আমেরিকানের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রত্যেককে এককালীন ৯০ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর বাইরে প্রায় ১০ লাখ আমেরিকানকে ৫০০ ডলার করে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থাও করছে প্রশাসন। হোয়াইট হাউসের ভাষ্য, স্বাস্থ্যবীমার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার অংশ হিসেবেই এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে।

নির্বাচনের আগে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক সুবিধার ঘোষণা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কৌশলবিদদের কেউ কেউ মনে করছেন, এসব পদক্ষেপ ভোটের ফলাফলে সীমিত হলেও প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো—তাৎক্ষণিক অর্থের প্রতিশ্রুতি কি মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের দীর্ঘস্থায়ী চাপকে আড়াল করতে পারবে?

ভোটারের হিসাব গ্যাস পাম্প ও গ্রোসারি দোকানে

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন অর্থনীতি। ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে আমেরিকান পরিবারের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি, খাদ্য, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়।

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় গ্যাসোলিনের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের দামে। পরিবারের বাজেটে চাপ বাড়লে সরকারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রচারও অনেক সময় ভোটারের কাছে গুরুত্ব হারায়। এখানেই ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংকটের মূল জায়গা। প্রশাসন অর্থনীতির নানা ইতিবাচক দিক তুলে ধরলেও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—গ্যাস স্টেশন ও গ্রোসারি দোকানে সেই স্বস্তি কোথায়?

যুদ্ধের রাজনীতি, নাকি অর্থনীতির বোঝা

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিও এখন নির্বাচনের আগে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে উঠছে। ইরানকে ঘিরে সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইউরোপের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যবিরোধ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে অস্থিরতা বেড়েছে।

এর মধ্যে নতুন করে ইরানকে ঘিরে সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানো হয়েছে। নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর সিদ্ধান্তও তাই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রাম্পের সমর্থকদের কাছে এটি শক্ত অবস্থানের প্রমাণ হলেও বিরোধীদের প্রশ্ন, বিদেশের সংঘাতের খরচ শেষ পর্যন্ত আমেরিকান জনগণকেই বহন করতে হবে কি না। নির্বাচনের সময় যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত যখন জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দামে এসে পড়ে, তখন পররাষ্ট্রনীতি আর দূরের কোনো বিষয় থাকে না। সেটি সরাসরি ভোটারের পারিবারিক বাজেটের অংশ হয়ে যায়।

বাইডেনের ভুল কি ট্রাম্পও করছেন

ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শেষ সময়ের রাজনৈতিক সংকটের মিল খুঁজছেন বিশ্লেষকেরা। বাইডেন প্রশাসন অর্থনীতি ও জনকল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে সেই উদ্যোগের সুফল যথেষ্ট দৃশ্যমান না হওয়ায় রাজনৈতিক জনপ্রিয়তায় তার প্রতিফলন ঘটেনি।

সাবেক বাইডেন প্রশাসনের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারিন জিন পেরির মতে, ট্রাম্পের সময় বন্ডবাজারের অস্থিরতা, সুদের হার, বাণিজ্যযুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাত তাঁর জনসমর্থন কমার কারণ ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।

এখানে ট্রাম্পের জন্য বড় শিক্ষা হলো—অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতি আর মানুষের আস্থা এক জিনিস নয়। ভোটার নিজের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন না দেখলে সরকারের সাফল্যের পরিসংখ্যান রাজনৈতিক সমর্থনে রূপ নেয় না। ২০২৪ সালে বাইডেন প্রশাসন সেই বাস্তবতার মূল্য দিয়েছে; ট্রাম্পও এখন একই রাজনৈতিক ফাঁদের মুখে পড়ছেন কি না, সেটিই প্রশ্ন।

কংগ্রেস হাতছাড়া হলে ট্রাম্পের লাগাম কার হাতে

বর্তমানে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তবে ব্যবধান খুব বেশি নয়। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে ফল ঘুরে গেলেই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যেতে পারে।

হিসাবটি তাই ট্রাম্পের জন্য উদ্বেগজনক। সিনেটে চারটি এবং প্রতিনিধি পরিষদে সাতটি আসনে রিপাবলিকানদের পরাজিত করতে পারলে, নিজেদের দখলে থাকা আসন ধরে রেখে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হতে পারে।

এর অর্থ শুধু কমিটি পরিচালনার ক্ষমতা বদল নয়। বাজেট, প্রশাসনিক ব্যয়, আইন প্রণয়ন, তদন্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ বিচারক নিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই ট্রাম্পকে বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে হবে।

যুদ্ধের ক্ষেত্রেও কংগ্রেসের রাজনৈতিক চাপ বাড়বে। সামরিক ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের অর্থায়ন নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা কঠোর অবস্থান নিলে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে।

৩ নভেম্বরের ফলেই শুরু হবে ২০২৮-এর হিসাব

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে ব্যালটে থাকবেন না। দুই মেয়াদের সীমার কারণে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী হতে পারবেন না। কিন্তু ২০২৬ সালের ফল তাঁর দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও ২০২৮-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পথ অনেকটাই নির্ধারণ করে দিতে পারে।

কংগ্রেসে বড় ধাক্কা খেলে রিপাবলিকান দলের ভেতরেই ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিপরীতে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল হলে তাঁর উত্তরাধিকার এবং দলের ওপর প্রভাব আরও শক্তিশালী হবে। অর্থাৎ ৩ নভেম্বরের ভোটে শুধু কংগ্রেসের আসন বদলাবে না; ট্রাম্প-পরবর্তী রিপাবলিকান রাজনীতির দিকও নির্ধারিত হতে শুরু করবে।

শেষ কথা বলবে আমেরিকান ভোটার

ট্রাম্প এখন ভোটারের সামনে একদিকে অর্থনৈতিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, অন্যদিকে শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির ছবি তুলে ধরছেন। কিন্তু এই দুই বার্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সাধারণ আমেরিকানের বাস্তব জীবন—গ্যাসের দাম, বাজার খরচ, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।

একবার রাজনৈতিক আস্থায় ফাটল ধরলে শুধু নগদ অর্থের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা মেরামত করা কঠিন। বাইডেনের অভিজ্ঞতা তার প্রমাণ। ট্রাম্পের সামনে এখন সেই একই পরীক্ষা।

৩ নভেম্বর তাই ট্রাম্পের জন্য শুধু মধ্যবর্তী নির্বাচন নয়—এটি তাঁর নীতির প্রতি আমেরিকান জনগণের আস্থার পরীক্ষা। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের ক্ষমতা কমবে, আর রিপাবলিকানদের পরাজয় হলে ২০২৮-এর লড়াই শুরু হবে আরও আগেই। তথ্যসূত্র: রয়টার্স।

সন্ধানী বার্তা /এমএইচ/এমকে


সম্পর্কিত খবর