আজ শিক্ষক দিবস। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো সভ্যতা নেই, যেখানে শিক্ষকের ভূমিকা অস্বীকার করা হয়েছে। কারণ শিক্ষক কেবল একটি পেশার মানুষ নন; তিনি একটি জাতির চিন্তা, চেতনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান কারিগর। একজন শিক্ষক একটি শিশুকে শুধু অক্ষরজ্ঞান দেন না, তিনি তাকে পৃথিবীকে দেখার চোখ দেন, প্রশ্ন করার সাহস দেন, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার শক্তি দেন।
শিক্ষক দিবস তাই শুধু ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়; এটি আত্মজিজ্ঞাসারও দিন। আমরা কেমন শিক্ষক চাই? আমরা শিক্ষকদের কী ধরনের মর্যাদা দিতে পারছি? আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা কী ধরনের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই?
আমার নিজের জীবনের সঙ্গে শিক্ষকতার সম্পর্কটি বিশেষভাবে গভীর। আমি নিজে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমার সহধর্মিনীও একজন শিক্ষক। আর আমার বাবা ছিলেন একজন হাইস্কুল শিক্ষক। ফলে শিক্ষকতা আমার কাছে শুধু একটি পেশাগত পরিচয় নয়; এটি আমার পারিবারিক স্মৃতি, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের অংশ।
ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে যখন হাট-বাজার কিংবা শহরের পথে বের হতাম, তখন একটি বিষয় আমাকে খুব বিস্মিত করত। বাবা ছিলেন না কোনো বড় আমলা, রাজনীতিবিদ বা ধনাঢ্য ব্যক্তি। তাঁর হাতে ছিল না ক্ষমতার কোনো দৃশ্যমান প্রতীক। কিন্তু পথে দেখা হলে মানুষ তাঁকে সম্মান করত, সালাম দিত, শ্রদ্ধার সঙ্গে কথা বলত।
শিশুমনে তখন প্রশ্ন জাগত—বাবার এমন সম্মানের কারণ কী?
একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আব্বু, তোমাকে এত মানুষ সালাম দেয় কেন?”
বাবা হেসে বলেছিলেন, “শিক্ষকেরা রাবণের গোষ্ঠী। এদের সবাই সম্মান করে। ধনসম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি না থাকলেও শিক্ষকের মর্যাদা থাকে।”
তখন কথাটির গভীরতা বুঝিনি। আজ বুঝি, বাবা একটি বড় সত্য খুব সহজ ভাষায় বলে গিয়েছিলেন। একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর পদ নয়, তাঁর আয় নয়, তাঁর সামাজিক ক্ষমতাও নয়। একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—কত মানুষের জীবনে তিনি আলো জ্বালাতে পেরেছেন।
একজন শিক্ষক চলে যান, কিন্তু তাঁর শিক্ষা থেকে যায়। তিনি হয়তো একটি বিদ্যালয়ের ছোট্ট কক্ষে বসে পাঠদান করেন, কিন্তু তাঁর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বহু দূর পর্যন্ত।
আমার নিজের শিক্ষাজীবনের দিকে ফিরে তাকালে এমন অসংখ্য শিক্ষকের মুখ মনে পড়ে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যাঁদের পেয়েছি, তাঁদের অনেকেই শুধু শিক্ষক ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন বন্ধু, অভিভাবক, পথপ্রদর্শক ও জীবনদর্শনের নির্মাতা।
আমি যে প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেছিলাম, সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪০ সালে। আমি যখন ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন একজন নতুন শিক্ষক আমাদের স্কুলে বদলি হয়ে এসেছিলেন। তাঁর নাম মনিমোহন রায়।
তিনি এসেছিলেন যেন একটি নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে। তাঁর আন্তরিকতা, নিষ্ঠা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি আস্থা আমাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিল। সেই স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫০ বছর পর আমি প্রথমবারের মতো বৃত্তি লাভ করি।
একজন শিক্ষকের অবদান কখনো শুধু একটি ফলাফলে পরিমাপ করা যায় না। একটি ভালো ফলাফলের পেছনে থাকে তাঁর অদৃশ্য শ্রম, তাঁর উৎসাহ, তাঁর বিশ্বাস এবং একজন শিক্ষার্থীর সম্ভাবনার ওপর তাঁর আস্থা।
মনিমোহন রায় স্যার আমার জীবনে সেই শিক্ষকদের একজন, যাঁরা প্রমাণ করেছেন—একজন শিক্ষক কখনো কখনো একটি শিশুর জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
কবি কাজী কাদের নেওয়াজ তাঁর বিখ্যাত কবিতা “শিক্ষকের মর্যাদা”-তে শিক্ষককে যে উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তা আমাদের সমাজের গভীর মূল্যবোধের প্রতিফলন। কবিতার মূল বক্তব্য হলো—ক্ষমতা, সম্পদ ও রাজকীয় প্রভাবের চেয়েও জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মর্যাদা বড়।
একজন প্রকৃত শিক্ষক সমাজের বিবেক। তিনি শুধু তথ্য দেন না, তিনি বোধ তৈরি করেন। তিনি শুধু পরীক্ষায় ভালো করার পথ দেখান না, তিনি জীবনে ভালো মানুষ হওয়ার পথ দেখান।
কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবতে হবে—আমরা কি শিক্ষকের সেই ঐতিহ্যগত মর্যাদা ধরে রাখতে পারছি?
সমাজ বদলেছে। পরিবার বদলেছে। প্রযুক্তি বদলেছে। শিক্ষার্থীদের চিন্তার ধরন বদলেছে। একসময় শিক্ষক ছিলেন জ্ঞানের প্রধান উৎস। এখন তথ্যের জন্য শিক্ষার্থীকে শুধু শিক্ষকের ওপর নির্ভর করতে হয় না; ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে তথ্য এখন সহজলভ্য।কিন্তু তথ্য আর শিক্ষা এক বিষয় নয়।
তথ্য মানুষকে জানায়, কিন্তু শিক্ষা মানুষকে বুঝতে শেখায়। তথ্য দক্ষতা তৈরি করে, কিন্তু শিক্ষা বিবেক তৈরি করে। আর এই বিবেক তৈরির কাজটি একজন শিক্ষকই করেন।
আজকের দিনে একজন শিক্ষকের দায়িত্ব আরও কঠিন। তাঁকে শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করতে হয় না; তাঁকে এমন এক প্রজন্ম তৈরি করতে হয়, যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করবে কিন্তু প্রযুক্তির দাস হবে না, মত প্রকাশ করবে কিন্তু অন্যের মতকে সম্মান করবে, প্রতিযোগিতা করবে কিন্তু মানবিকতা হারাবে না।
বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যেমন অগ্রগতি হয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হয়েছে, শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু একই সঙ্গে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণার পরিবেশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয় উঠে এসেছে।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ শিক্ষক তৈরি, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা।
বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকের ভূমিকা এখন নতুনভাবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি চিন্তা, গবেষণা ও নতুন জ্ঞান তৈরির কেন্দ্র। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে তাই পাঠদানের পাশাপাশি গবেষক, চিন্তক ও সমাজের একজন দায়িত্বশীল বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মী হিসেবেও ভূমিকা রাখতে হয়।
বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় শিক্ষকের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। নানা ধরনের বিভাজন, অসহিষ্ণুতা ও মূল্যবোধের সংকটের সময়ে শিক্ষককে তরুণদের মধ্যে যুক্তিবোধ, সহনশীলতা ও মানবিকতা তৈরি করতে হয়।
শিক্ষকই শেখান—প্রশ্ন করা অপরাধ নয়; বরং প্রশ্ন থেকেই জ্ঞানের শুরু। ভিন্নমত মানেই শত্রুতা নয়; বরং যুক্তির মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানই সভ্যতার পথ।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার শ্রেণিকক্ষেই তৈরি হয়। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের প্রশাসক, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, রাজনীতিবিদ ও সমাজনেতা হবে। তাই একজন শিক্ষকের হাতে শুধু একটি শ্রেণির শিক্ষার্থী নয়, একটি জাতির ভবিষ্যৎ থাকে।
আমরা প্রায়ই দেশের উন্নয়নের কথা বলি। উন্নত অবকাঠামো, প্রযুক্তি, অর্থনীতি—সবই প্রয়োজন। কিন্তু এসবের ভিত্তি হলো দক্ষ ও মানবিক মানুষ। আর সেই মানুষ তৈরির প্রথম কারিগর হলেন শিক্ষক।
আজ শিক্ষক দিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি আমার সকল শিক্ষককে। যাঁরা আমাকে অক্ষর চিনিয়েছেন, জ্ঞান দিয়েছেন, চিন্তা করতে শিখিয়েছেন, নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার সাহস দিয়েছেন—তাঁদের ঋণ কোনোদিন শোধ করার নয়।
শ্রদ্ধা জানাই আমার বাবা, আমার সহধর্মিনী এবং পৃথিবীর সকল শিক্ষককে।
তাঁরা হয়তো সবসময় ইতিহাসের পাতায় স্থান পান না, কিন্তু ইতিহাসের মানুষগুলো তৈরি হয় তাঁদের হাত ধরেই।
একজন শিক্ষক হয়তো একদিনে পৃথিবী বদলে দিতে পারেন না; কিন্তু তিনি এমন মানুষ তৈরি করেন, যারা একদিন পৃথিবী বদলে দিতে পারে।
লেখকঃ সহযোগী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইলঃ asmnh.04@ru.ac.bd