ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর এবার কাজের পালা। পাঁচ বছর পর আবার সেই জনগণের কাছেই ফিরতে হবে জনপ্রতিনিধিদের। তাই প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব কাজ, বক্তব্যের চেয়ে দৃশ্যমান সেবা এবং ক্ষমতার চেয়ে জবাবদিহিকেই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। তিনি বলেছেন, ‘জনপ্রতিনিধিরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। পাঁচ বছর পর আবার তাদের জনগণের কাছে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে।’
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের সমবায় ভবনের মাল্টিপারপাস হলরুমে স্থানীয় সরকার বিভাগ আয়োজিত ‘সৌর বিদ্যুৎ, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও উন্নয়ন কর্মসূচি পর্যালোচনা সভায়’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
- জনগণের প্রত্যাশা পূরণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান
- সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার প্রস্তাব
- সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারে জোর স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর
উন্নয়নের হিসাব দিতে হবে জনগণকেই
ড. আবদুল মঈন খান বলেন, জনগণের সেবা নিশ্চিত করা এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করা নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব। এ বক্তব্যে সরকারের কাজের মূল্যায়নের মাপকাঠিও স্পষ্ট করেছেন তিনি। প্রকল্প গ্রহণ বা অর্থ বরাদ্দ নয়, বরং সেই প্রকল্পের সুফল মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছাল—শেষ পর্যন্ত তারই হিসাব দিতে হবে জনপ্রতিনিধিদের। মন্ত্রী প্রশাসনের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে দ্রুত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।

‘সীমিত সম্পদ, সর্বোচ্চ ব্যবহার’
স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ সম্পদের সীমাবদ্ধতা। এ বাস্তবতায় নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামো ও সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে। কারণ নীতি ও প্রকল্প কেন্দ্র থেকে নির্ধারিত হলেও এর বাস্তব ফলাফল নির্ভর করে মাঠ প্রশাসনের দক্ষতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয়তার ওপর।
বিদ্যুৎ সংকটে সৌর প্যানেল
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের পাশাপাশি গ্রামীণ বাড়ির ছাদেও সৌর প্যানেল স্থাপনে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলেন তিনি। দিনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করে রাতে ব্যবহার করার প্রস্তাবও দেন ড. আবদুল মঈন খান। তাঁর মতে, এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।অর্থাৎ স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংরক্ষণের একটি বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনাই সামনে আনলেন তিনি।
‘সততা ও দক্ষতাই অগ্রাধিকার’
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মোঃ আব্দুল বারী সরকারি সেবা ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সততা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, পদায়ন ও পদোন্নতিতে সততা ও কর্মদক্ষতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিজ কর্মস্থলকে নিজের এলাকা মনে করে আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি। এর মাধ্যমে মাঠ প্রশাসনে দায়িত্বশীলতা ও কর্মদক্ষতাকে আরও জোরালো করার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
চার বছরে ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আগামী চার বছরে ধাপে ধাপে সব পরিবার ও কৃষকের কাছে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। সার ডিলারদের তালিকা যাচাই শেষে দ্রুত লাইসেন্স দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
অবকাঠামো খাতে গ্রামীণ ছোট সড়কে ইটের বদলে সিসি ও ইউনি ব্লক ব্যবহারের পরামর্শ দেন মীর শাহে আলম। হাটবাজার ও বন্দর এলাকার সড়কে ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সড়কের পাশে পুকুর খননের ক্ষেত্রে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার ওপরও জোর দেন তিনি।
স্থানীয় নির্বাচন সামনে, ইউএনওদেরও বার্তা
ইজিবাইক নিবন্ধনের জন্য আইন ও বিধিমালার কাজ চলছে বলে জানান মীর শাহে আলম। পাশাপাশি বর্জ্য থেকে জৈবসার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদ্যাপনে প্রশাসন, পূজা কমিটি ও সামাজিক নিরাপত্তা কমিটিকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।
এর পাশাপাশি আগামী জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে ইউএনওদের আন্তরিক হওয়ার নির্দেশনাও দেন তিনি। মাদক নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতি হ্রাসে সক্রিয় ভূমিকার পাশাপাশি প্রতি বছর ইউএনও সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব দেন মীর শাহে আলম।
বার্তা স্পষ্ট, এখন বাস্তবায়নের পালা
সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মোঃ শহীদুল হাসান, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিজ মিরানা মাহরুখ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া সব সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলার উপপরিচালক (স্থানীয় সরকার), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পৌরসভার প্রশাসকরাও সভায় অংশ নেন।
সভায় দেওয়া বক্তব্যের সারকথা এক জায়গায় এসে মিলে যায়—জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসা সরকারের কাছে এখন দৃশ্যমান কাজের প্রত্যাশা। আর সেই কাজের গতি, মান ও ফলাফলই আগামী দিনের জবাবদিহির ভিত্তি তৈরি করবে। নির্বাচনের মাঠে ভোটারদের রায় পাওয়া গেছে; এবার মাঠ প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সামনে সেই রায়ের প্রতিফলন ঘটানোর পালা।
সন্ধানী বার্তা /এমএএএমকে