দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও কাঁচামালের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, এলপিজি, পানি, ভাড়া, পরিবহন ও শ্রম ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছে রেস্তোরাঁ খাত। এর প্রভাবে দেশের রেস্তোরাঁগুলোর সার্বিক বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাবারের দাম বাড়াতে না পারায় অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার জন্য হিমশিম খাচ্ছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) পুরানা পল্টনের ফার্স হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়ে সংকট উত্তরণে সরকারের কাছে নয় দফা দাবি তুলে ধরে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি।
- খাদ্যপণ্য থেকে গ্যাস-বিদ্যুৎ, সব খরচই ঊর্ধ্বমুখী
- ওয়ান স্টপ সার্ভিস, কর প্রত্যাহার ও গরুর মাংস আমদানির দাবি
সংগঠনের মহাসচিব ইমরান হাসান লিখিত বক্তব্যে বলেন, চাল, ডাল, তেল, মাংস, মাছ, মশলা, শাকসবজি ও ডিমসহ প্রায় সব খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে গ্যাস, বিদ্যুৎ, এলপিজি, পানি, ভাড়া, পরিবহন ও শ্রম ব্যয়। কিন্তু এসব ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে খাবারের দাম বাড়াতে গেলে গ্রাহক কমে যায়। ফলে একদিকে খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বিক্রি কমছে।
ইমরান হাসান বলেন, ‘রেস্তোরাঁগুলোর সার্বিক বিক্রি এখন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। যে কারণে এখন ব্যবসায় টিকে থাকা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’ তিনি বলেন, রেস্তোরাঁ শিল্পের টেকসই বিকাশ, কর্মসংস্থান সংরক্ষণ এবং ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান নীতি ও ব্যয় কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
নয় দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির দাবিগুলো হলো—১. রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনায় দ্রুত ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু ও বাস্তবায়ন করতে হবে। ২. দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে মালিকরা যেন খাবারের দাম সমন্বয় করতে পারেন, সে ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ৩. ভ্যাট আদায়ের নামে সরকারি কর্মকর্তাদের হয়রানি বন্ধ করতে হবে এবং সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ ও উৎসে কর ২ শতাংশ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে। ৪. এলপিজি ও জ্বালানি সংকটের দ্রুত সমাধান করতে হবে এবং লোডশেডিং কমিয়ে আনতে হবে। ৫. বিভিন্ন দপ্তরের অভিযানের নামে রেস্তোরাঁ মালিকদের হয়রানি ও অহেতুক আর্থিক জরিমানা বন্ধ করতে হবে।
৬. রেস্তোরাঁ খাতকে শিল্প ঘোষণার সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন, এ খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট শিল্পনীতি প্রণয়ন এবং রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সদস্যপদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়। ৭. রেস্তোরাঁ খাতের চাহিদা পূরণ ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে গরুর মাংস আমদানির অনুমতি দিতে হবে।৮. ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন রাজনৈতিক বা সামাজিক দলের সঙ্গে ট্যাগিং করে হয়রানি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করে নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ৯. রেস্তোরাঁ খাতের শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি এ শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
একাধিক অনুমোদনের জটিলতা দূর করার দাবি
ইমরান হাসান বলেন, বর্তমানে একটি রেস্তোরাঁ পরিচালনার জন্য একাধিক দপ্তর থেকে ১০ থেকে ১২টি অনুমোদন নিতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়। ব্যবসা পরিচালনা এবং কার্যকর তদারকি—দুই ক্ষেত্রেই এ ব্যবস্থা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। তাই রেস্তোরাঁ খাতকে সমন্বিত কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার আওতায় এনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর প্রস্তাব দেন তিনি।
ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রেও হয়রানি বন্ধের দাবি জানান ইমরান হাসান। তিনি বলেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও রেস্তোরাঁ মালিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে রেস্তোরাঁ পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলেও জানান তিনি। বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বলেন, ২০২২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রেস্তোরাঁ খাতকে শিল্পের মর্যাদা দেওয়া হলেও উদ্যোক্তারা এখনো এর সুফল যথাযথভাবে পাচ্ছেন না। শিল্প, চাপ সৃষ্টি, অনৈতিক সুবিধা দাবি কিংবা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।
এলপিজি সংকটে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়
এলপিজির সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে রেস্তোরাঁ পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলেও জানান তিনি। বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন এলপিজি সরবরাহ, কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মূল্য আদায় বন্ধে কঠোর বাজার তদারকির দাবি জানানো হয়।
ইমরান হাসান আরও বলেন, ২০২২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রেস্তোরাঁ খাতকে শিল্পের মর্যাদা দেওয়া হলেও উদ্যোক্তারা এখনো এর সুফল যথাযথভাবে পাচ্ছেন না। শিল্প ঘোষণার বাস্তবায়ন এবং রেস্তোরাঁ খাতের জন্য পৃথক শিল্পনীতি প্রণয়নের দাবি জানান তিনি।
গরুর মাংস আমদানির বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে নগরভিত্তিক রেস্তোরাঁগুলোতে মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন গরুর মাংস সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ। বাজারে গরুর মাংসের দাম ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত হওয়ায় তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি শাহ সুলতান খোকন, প্রথম যুগ্ম মহাসচিব মো. ফিরোজ আলম সুমন, সাংগঠনিক সম্পাদক তৌফিকুর ইসলাম, যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান বিপুসহ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সন্ধানী বার্তা/আরআই/এমকে