জাতীয়

স্বামীর ওয়ার্ড থেকে সংসদে, পাঁচ মাসেই বিদায় মিষ্টির

স্বামী খুন হলেন, তাঁর শূন্য হয়ে যাওয়া ওয়ার্ডে ভোটে দাঁড়ালেন স্ত্রী। জয়ী হয়ে কমিশনার হলেন ফেরদৌসী আহমেদ ওরফে মিষ্টি। সেখান থেকে স্থানীয় রাজনীতি, মহানগর বিএনপির দায়িত্ব, মামলা-মোকদ্দমা পেরিয়ে দুই দশকের পথচলায় পৌঁছালেন জাতীয় সংসদে। কিন্তু সংসদে শপথ নেওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় সেই যাত্রায় ছেদ পড়ল। মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় তাঁর নাম সামনে আসার পর পদত্যাগ করলেন তিনি।

মিষ্টির রাজনৈতিক উত্থানের গল্পে দুটি নাম বারবার ফিরে আসে—স্বামী সাইদুর রহমান নিউটন এবং বড় ভাই নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু। নিউটন ছিলেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা ও একই ওয়ার্ডের কমিশনার। পিন্টু ছিলেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি, পরে সংসদ সদস্য ও বিএনপির নেতা। তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়া যেমন মিষ্টির পথচলায় ছিল, তেমনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ও তৈরি করেছেন তিনি স্থানীয় নির্বাচন ও দলীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে।

  • স্বামী খুনের পর উপনির্বাচনে জয়
  • ভাই পিন্টুর পথ ধরে বিএনপির রাজনীতিতে উত্থান
  • কমিশনার থেকে মহানগর বিএনপি, তারপর সংসদ
  • রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় বিতর্কের পর পদত্যাগ

স্বামীর মৃত্যুই খুলে দেয় নতুন দরজা

মিষ্টির রাজনৈতিক হাতেখড়ি বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে। ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী হিসেবে যুক্ত হয়ে তিনি কলেজ ছাত্র সংসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক বা এজিএস নির্বাচিত হন। তখন তাঁর বড় ভাই পিন্টুও ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয়। এরপর আসে ২০০২ সাল। মিষ্টির স্বামী নিউটন তখন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতিও ছিলেন তিনি।

কিন্তু কমিশনার হিসেবে শপথ নেওয়ার মাত্র তিন দিন পরই ধানমন্ডিতে গুলিতে নিহত হন নিউটন। স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁরই ওয়ার্ডের উপনির্বাচনে প্রার্থী হন মিষ্টি। সাধারণ ওয়ার্ডের ভোটারদের সরাসরি ভোটে কমিশনার নির্বাচিত হন তিনি। রাজনীতিতে তাঁর প্রথম বড় নির্বাচনী জয় আসে স্বামীর মৃত্যুর পর, স্বামীরই ওয়ার্ডে।

নিউটনের গল্প যেখানে থেমেছিল

নিউটনের রাজনীতির শুরু ছাত্রদল দিয়ে। তেজগাঁও কলেজে পড়ার সময় সংগঠনটিতে যুক্ত হয়ে ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করেন। পরে মহানগর পেরিয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি হন। কমিশনার হওয়ার পরও বেশি দিন দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। ছোট ভাইয়ের বিয়েতে যোগ দিতে ধানমন্ডিতে গিয়ে অর্কিড প্লাজার একটি সেলুন থেকে বের হওয়ার সময় গুলিতে নিহত হন তিনি। তাঁর গাড়িচালকও গুলিবিদ্ধ হন। নিউটনের মা রাবেয়া বেগম সেদিনই হত্যা মামলা করেন।

২০০৬ সালে বিচারিক আদালত মামলায় ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে হাইকোর্টের রায়ে কয়েকজন খালাস পান এবং কয়েকজনের সাজা পরিবর্তিত হয়। নিউটনের বিরুদ্ধে ৩৬টি ফৌজদারি মামলার তথ্যও সে সময় প্রকাশিত হয়েছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, রাজনৈতিক কারণে এসব মামলা করা হয়েছিল। স্বামীর হত্যার পর তাঁর ওয়ার্ডে জয়ী হওয়া মিষ্টির জন্য তাই শুধু একটি নির্বাচনী বিজয় ছিল না; সেটিই তাঁকে স্থানীয় রাজনীতির দৃশ্যমান মুখ করে তোলে।

কমিশনারের চেয়ার থেকে মহানগর বিএনপি

কমিশনার হিসেবে মিষ্টি নিজের কাজের যে বিবরণ দিয়েছিলেন, তাতে ছিল গ্যাসলাইনের সমস্যা সমাধান, অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে শিশুদের খেলার মাঠ তৈরি এবং এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কমার দাবি। গৃহকর্মীদের অধিকার নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আয়োজিত একটি কর্মসূচিতেও নেতৃত্ব দেন।

এরপর স্থানীয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে দলীয় সংগঠনে তাঁর অবস্থান তৈরি হয়। ২০১৮ সালে তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সহসভাপতি ছিলেন। ওই বছর ঢাকা-১৪ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নও চেয়েছিলেন।

তখন তিনি জানিয়েছিলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ২০টি মামলা হয়েছে। তাঁর দাবি ছিল, মামলাগুলো ষড়যন্ত্রমূলক ও মিথ্যা। পরে বিলুপ্ত ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পান।

ভাই পিন্টু: ছাত্রদল থেকে সংসদ

মিষ্টির নিজের রাজনৈতিক পথচলার পাশাপাশি পরিবারের আরেকটি শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয় ছিল বড় ভাই পিন্টু। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি—দুই পদেই ছিলেন তিনি। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০০ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন পিন্টু। ছাত্রদলের সভাপতি থাকা অবস্থায় ২০০১ সালের নির্বাচনে তৎকালীন ঢাকা-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য হন। পরে বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনও ছিল মামলা ও কারাবাসে জর্জরিত। ২০০১ সালে একটি দেউলিয়া প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তির নিলামের দরপত্রের কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। পরে বিএনপি সরকার মামলাটি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক দাবি করে ২০০৫ সালে তা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়। ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় করা পিলখানা হত্যা মামলায় ২০১৩ সালে পিন্টুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাবন্দী অবস্থায় ২০১৫ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন করতে চাইলেও দণ্ডিত হওয়ায় তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়।

একই বছরের ৩ মে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। চিকিৎসকেরা হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার কথা জানান। পরিবার ও বিএনপি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুললেও কারা কর্তৃপক্ষ ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তা অস্বীকার করেন।

দুই দশকের পর সংসদে

স্বামী ও ভাই—দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যুর পরও মিষ্টি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। স্থানীয় নির্বাচন, মহানগর বিএনপির দায়িত্ব—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। চলতি বছরের এপ্রিলে বিএনপি তাঁকে ত্রয়োদশ

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেয়। সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ থেকে নির্বাচিত হয়ে ৩ মে শপথ নেন। এটিই ছিল তাঁর প্রথম সংসদীয় মেয়াদ। কিন্তু সংসদে প্রবেশের পর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে দ্রুত বাঁক আসে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায়।

রাড্ডার ঘটনায় সামনে পুরোনো স্বাক্ষর

গত ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়।

এরপর সামনে আসে ২০০৬ সালের একটি আবেদন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জায়গা বরাদ্দ চেয়ে সমিতির পক্ষ থেকে করা ওই আবেদনে সভাপতি হিসেবে মিষ্টির স্বাক্ষর ছিল। তখন তিনি শাহ আলী থানা এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার।

হামলার সঙ্গে অভিযুক্ত কয়েকজনের সঙ্গে মিষ্টির ঘনিষ্ঠতার তথ্যও সামনে আসে। তবে মিষ্টি সমিতির সঙ্গে বর্তমানে কোনো সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তিনি নাকচ করেছেন। রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আক্তার এ ঘটনায় মামলা করেছেন। এতে হানিফ মিয়ার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

পাঁচ মাসেই শেষ অধ্যায়

ঘটনার পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও দ্রুত পদক্ষেপ আসে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই দিনে মহানগর উত্তর যুবদল ও মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত হয়। বিএনপির তিনজন, ছাত্রদলের পাঁচজন, স্বেচ্ছাসেবক দলের দুজন ও শ্রমিক দলের চারজনকে বহিষ্কার করা হয়।

এর পরদিন, ১ অক্টোবর, মিষ্টি জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগপত্র জমা দেন। সংসদ সচিবালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সেদিনই সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ শূন্য ঘোষণা করা হয়।

স্বামীর হত্যার পর তাঁরই ওয়ার্ডের ভোটে যে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা গড়িয়েছিল স্থানীয় সরকার থেকে মহানগর বিএনপি হয়ে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত। সেই যাত্রায় ছিল নিউটনের অসমাপ্ত রাজনীতি, পিন্টুর উত্থান, নিজের নির্বাচনী সাফল্য ও দলীয় পদ। শেষ পর্যন্ত সংসদে প্রবেশের মাত্র পাঁচ মাস পর রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনা ঘিরে পদত্যাগের মধ্য দিয়ে থামল মিষ্টির সংসদীয় অধ্যায়।

সন্ধানী বার্তা /জেএন/এমকে


সম্পর্কিত খবর