এক্সক্লুসিভ

অধিকার আছে, তথ্য নেই

তথ্য পাওয়ার অধিকার বাংলাদেশের নাগরিকের আইনগত স্বীকৃত অধিকার। কিন্তু অধিকারটি কাগজে যতটা স্পষ্ট, বাস্তবে তার ব্যবহার ততটাই সীমিত। তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে সচেতনতা ধীরে ধীরে বাড়লেও কোথায় আবেদন করতে হবে, কীভাবে তথ্য চাইতে হবে, নির্ধারিত সময়ে তথ্য না পেলে কোথায় আপিল করতে হবে—এসব মৌলিক বিষয়েই বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে আইন আছে, চাহিদাও আছে; কিন্তু দুইয়ের মাঝখানে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ এক ব্যবধান।

  • আইন সম্পর্কে জানেন ১০.৫%
  • কিন্তু কীভাবে তথ্য চাইতে হয় জানেন মাত্র ৮%
  • ভয়, অজ্ঞতা ও দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় আটকে নাগরিকের জানার অধিকার

বাংলাদেশ তথ্য অধিকার ফোরামের ‘বাংলাদেশ তথ্য অধিকার জরিপ-২০২৬’ সেই ব্যবধানেরই একটি চিত্র তুলে ধরেছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ফার্মগেটে আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সম্মেলনে জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়।

সচেতনতা বাড়ছে, সুযোগ বাড়ছে না
২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নাগরিকদের তথ্যের প্রয়োজন, আইন সম্পর্কে ধারণা, আইন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা এবং তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে।

জরিপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—দেশের ৭২.৪ শতাংশ নাগরিক মনে করেন, প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ তাদের নেই। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৬৮.৩ শতাংশ। অর্থাৎ ছয় বছরে আইন সম্পর্কে সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার বাস্তব সুযোগে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে নাগরিক সচেতনতা ২০১৯ সালের ৭.৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে ১০.৫ শতাংশ হয়েছে। শহরে এই হার ১২.৪ শতাংশ, গ্রামে ৯.৭ শতাংশ। তরুণদের মধ্যে সচেতনতা প্রায় ১৮.৫ শতাংশ এবং গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে প্রায় ৩৮ শতাংশ। সংখ্যাগুলো বলছে, নতুন প্রজন্ম ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে আইনটির পরিচিতি বাড়ছে। কিন্তু পরিচিতি এখনো ব্যাপক নাগরিক ব্যবহারে রূপ নেয়নি।

জানেন আইন, জানেন না পথ
তথ্য অধিকার ব্যবহারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এখানেই। আইন সম্পর্কে যারা জানেন, তাদের মধ্যেও মাত্র ৮ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত। নির্ধারিত সময়সীমা সম্পর্কে জানেন মাত্র ৯.৩ শতাংশ।

আপিলের ক্ষেত্রেও বিভ্রান্তি স্পষ্ট। জরিপে ৪৬ শতাংশ নাগরিক মনে করেন, তথ্য না পেলে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আপিলের বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন। মাত্র ১৯.৯ শতাংশ সঠিকভাবে তথ্য কমিশনকে আপিল কর্তৃপক্ষ হিসেবে শনাক্ত করতে পেরেছেন।

অর্থাৎ আইনটি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা তৈরি হলেও এর ব্যবহারিক কাঠামো নাগরিকের কাছে এখনো যথেষ্ট পরিচিত নয়। ফলে অধিকার থাকা সত্ত্বেও অনেকে প্রথম ধাপেই থেমে যাচ্ছেন।

তথ্য চাইতেও ভয়
শুধু অজ্ঞতাই বাধা নয়; তথ্য চাওয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য ঝুঁকির আশঙ্কাও নাগরিকদের পিছিয়ে দিচ্ছে। জরিপে ‘ফিয়ার অব রিটালিয়েশন’ বা প্রতিশোধের ভয়কে তথ্য অধিকার আইন ব্যবহারের বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে বিস্তারিত তথ্য দিতে অনীহা।

বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সমস্যা আরও গভীর। তথ্য পেতে অনেককে মধ্যস্থতাকারীর সহায়তা নিতে হচ্ছে, যা তাদের স্বাধীনভাবে অধিকার ব্যবহারের পথে বাড়তি বাধা তৈরি করছে।

তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও প্রস্তুত নয়
তথ্য চাওয়ার অপর প্রান্তে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার প্রশ্ন। জরিপে সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৪৯ শতাংশ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। আবার ৬৪ শতাংশ কর্মকর্তা এখনো কোনো তথ্যের আবেদনই পাননি। এর অর্থ, একদিকে নাগরিকের তথ্য চাওয়ার সক্ষমতা সীমিত, অন্যদিকে অনেক প্রতিষ্ঠানে তথ্য সরবরাহের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কাঠামোও পুরোপুরি সক্রিয় নয়। ফলে তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন একটি দ্বিমুখী সক্ষমতার সমস্যায় আটকে আছে।

কমিশন অকার্যকর, আটকে ৮৫০ শুনানি
এই সংকটকে আরও জটিল করেছে দীর্ঘ সময় তথ্য কমিশন কার্যকর না থাকা। বর্তমানে ৮৫০-এর বেশি শুনানি আটকে আছে বলে সম্মেলনে জানানো হয়েছে। নতুন আবেদন ও আপিল নিষ্পত্তিতেও এর প্রভাব পড়েছে। এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, নতুন কমিশন গঠনের পর পুরোনো শুনানিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কৌশলগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি নতুন আবেদন ও শুনানি নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও করতে হবে।

তথ্যের যুগে নির্ভরযোগ্য তথ্যের লড়াই
তথ্য কমিশন বাংলাদেশের সচিব মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, একসময় দেশে তথ্যের সংকট থাকলেও এখন তথ্যের আধিক্য দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে অপতথ্য ও মিথ্যা তথ্যের বিস্তার জনজীবন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করছে। তাই এখন প্রয়োজন যাচাই করা ও নির্ভরযোগ্য তথ্য।

তবে তথ্যের মান নিশ্চিত করার নামে তথ্যপ্রবাহ সীমিত করার ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেছেন বক্তারা। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অপতথ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকতে পারে; কিন্তু এর অজুহাতে তথ্য অধিকার সংকুচিত করা উচিত নয়। ভবিষ্যৎ তথ্য কমিশনকে স্বাধীন ও প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করার সক্ষমতা দিতে হবে।

চাহিদা না বাড়লে আইনও থাকবে সীমিত
২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের পর এক যুগের বেশি সময় পেরিয়েছে। সচেতনতা বেড়েছে, কিন্তু তা এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যেখানে নাগরিকের নিয়মিত তথ্যচর্চা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বচ্ছ হতে বাধ্য করবে।

সুশাসনের জন্য তাই শুধু আইন কার্যকর করাই যথেষ্ট নয়। নাগরিককে জানতে হবে কী তথ্য চাইতে হবে, কোথায় চাইতে হবে এবং না পেলে কীভাবে প্রতিকার চাইতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তথ্য প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

শেষ পর্যন্ত তথ্য অধিকার আইনের সাফল্য নির্ভর করবে আইনের অস্তিত্বে নয়, তার ব্যবহারে। নাগরিক যত বেশি তথ্য চাইবে, প্রতিষ্ঠান যত বেশি তথ্য দেবে এবং প্রতিকারব্যবস্থা যত দ্রুত কাজ করবে—ততই কাগজের অধিকার বাস্তব নাগরিক ক্ষমতায় রূপ নেবে।

জেএন/এমকে


সম্পর্কিত খবর