রাশিয়ার একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। রোববারের এসব হামলায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে উত্তরাঞ্চলীয় সুমি শহরে। একই সময়ে জাপোরিঝঝিয়া, কিয়েভ ও ওদেসাসহ বিভিন্ন এলাকাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বলছেন, মস্কো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর হামলার তীব্রতা আরও বেড়েছে।
সুমিতে শিশু কেন্দ্রে হামলা, নিহত ৩
ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান ভিহিভস্কি জানিয়েছেন, সুমি শহরের একটি শিশু কেন্দ্রে রুশ হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীও রয়েছে। ঘটনাটি হামলার সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে রাতের হামলায় আরও তিনজন নিহত হয়েছেন। কিয়েভে একটি রুশ ড্রোন হামলায় একজন নিহত হওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
কিয়েভে ক্ষতিগ্রস্ত ১৬ স্থাপনা
রাজধানী কিয়েভেও রুশ ড্রোন হামলা হয়েছে। মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকোর তথ্য অনুযায়ী, হামলায় এক নারী ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোর আহত হয়েছে। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কিয়েভের আঞ্চলিক প্রশাসন জানিয়েছে, হামলায় মোট ১৬টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি আবাসিক ভবন, একটি গুদাম ও একটি উৎপাদনকেন্দ্র রয়েছে। হামলার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা যায়।
ওদেসায়ও ব্যাপক হামলা
ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় ওদেসা অঞ্চলেও বড় ধরনের হামলার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় গভর্নর ওলেহ কিপার জানিয়েছেন, হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েকটি আবাসিক ভবন, একটি দোকান, হোটেল, চিকিৎসাকেন্দ্র ও শস্যগুদাম।
এর ফলে একদিনের হামলায় ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত আটজনে।
এক সপ্তাহে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ হামলা
জেলেনস্কির দাবি, গত সাত দিনে ইউক্রেনের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় ৩ হাজার ৯০০টি ড্রোন, আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে রাশিয়া।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ওই সময়ে রাশিয়া ২ হাজার ২০০টির বেশি আক্রমণাত্মক ড্রোন, প্রায় ১ হাজার ৬৫০টি আকাশ বোমা এবং বিভিন্ন ধরনের ৩৮টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
জেলেনস্কির ভাষ্য, এসব হামলায় আবাসিক ভবনের পাশাপাশি দুটি কিন্ডারগার্টেন, দুটি স্কুলসহ বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
‘শাহেদ’ হামলা নিয়ে জেলেনস্কির অভিযোগ
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট বলেন, রাশিয়া যদি সত্যিই যুদ্ধের তীব্রতা কমাতে চাইত, তাহলে সাম্প্রতিক সময়ে ‘শাহেদ’ ড্রোনের এমন ধারাবাহিক হামলা দেখা যেত না।
রাশিয়ার পক্ষ অবশ্য বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, কিয়েভভিত্তিক কিয়েভস্টার ও ওমেগা টেলিকমের দুটি ডেটা সেন্টারে হামলা চালানো হয়েছে। মস্কোর ভাষ্য, এসব প্রতিষ্ঠান ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীকে বিভিন্ন ধরনের সেবা দিয়ে আসছিল।
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা মস্কোর
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে শনিবার দেওয়া বক্তব্যে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেন, মস্কো তাদের সামরিক অভিযান ‘শেষ পর্যন্ত’ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। একই সময়ে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইউক্রেনের খারকিভ অঞ্চলের সীমান্তবর্তী খ্রিপুনি গ্রাম দখলের দাবি করেছে।
খারকিভ অঞ্চলকে অবশ্য রাশিয়া নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে না। যুদ্ধের সময় অঞ্চলটির কিছু এলাকায় রুশ বাহিনী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাশিয়া দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। একই সঙ্গে পূর্ব ইউক্রেনের আরও এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার লক্ষ্যও মস্কো প্রকাশ্যে জানিয়েছে।
কূটনৈতিক উদ্যোগেও নেই বড় অগ্রগতি
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে কূটনৈতিক উদ্যোগ চললেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই দুই পক্ষের হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে।
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে বেসামরিক মানুষের হতাহত ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক হামলায় আবাসিক ভবন ও অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় সেই উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
সন্ধানী বার্তা/জেএন