জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য শুধু বৈশ্বিক ইস্যুতে অবস্থান তুলে ধরার মঞ্চ হয়ে থাকছে না; এর ফাঁকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্ত করারও সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ধারাবাহিক বৈঠকগুলোতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার মতো খাত সামনে এসেছে। ফলে এবারের সফরে বাংলাদেশের কূটনীতিতে রাজনৈতিক যোগাযোগের সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে।
- নিউইয়র্কে একাধিক বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা
- ক্রোয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও সুইডেনের সঙ্গে বৈঠকে অংশীদারত্ব বাড়াতে জোর
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেসসচিব এ কে এম নাজমুল হক জানান, বিভিন্ন দেশের সরকার ও মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এসব বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ইউরোপের দরজায় ক্রোয়েশিয়া
২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতার সম্ভাবনাও গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশের জন্য এই আলোচনার তাৎপর্য কেবল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তি ও শিক্ষায় সহযোগিতা বাড়াতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি আরও বহুমুখী হতে পারে। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ বহুপক্ষীয় ফোরামে দুই দেশের সমন্বয় বাড়ানোর আলোচনা সম্পর্কটিকে অর্থনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করছে।
থাইল্যান্ডে আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্ভাবনা
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গে বৈঠকেও উঠে আসে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়গুলো। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী মতবিনিময় করেন।
এর আগে ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে আনুতিন চার্নভিরাকুলের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন। একই মঞ্চে ধারাবাহিক উপস্থিতির বাইরে দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠক আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে সরাসরি আলোচনার সুযোগও তৈরি করেছে।
বিশেষ করে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে এ সম্পর্কের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণের অবকাশ তৈরি হয়েছে।
সুইডেনের সঙ্গে স্বাস্থ্য কূটনীতিতে জোর
সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমের স্টেনারগার্ডের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পায়। ইউএনএফপিএ আয়োজিত উচ্চ পর্যায়ের অনুষ্ঠানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারির ভূমিকা শক্তিশালী করা এবং মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে সহযোগিতার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
স্বাস্থ্য খাতের এই সহযোগিতা বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
অর্থনৈতিক কূটনীতির পাশাপাশি মানব উন্নয়নভিত্তিক সহযোগিতাকেও গুরুত্ব দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক অংশীদারত্বের পরিসর বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কেন্দ্রে অর্থনীতি
নিউইয়র্কের বৈঠকগুলোর দিকে একসঙ্গে তাকালে একটি অভিন্ন প্রবণতা চোখে পড়ে—বাংলাদেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলোকে আরও বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে যুক্ত করা হচ্ছে একই কাঠামোয়।
এর ফলে ইউএনজিএর মতো বহুপক্ষীয় আয়োজন বাংলাদেশের জন্য শুধু বৈশ্বিক বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ নয়, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ গভীর করার ক্ষেত্রও হয়ে উঠছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার আলাদা আলাদা ক্ষেত্র নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য একটি বিস্তৃত ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে নিউইয়র্ক সফরের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে তাৎক্ষণিক কোনো চুক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র চিহ্নিত করা। এখন এসব আলোচনাকে কার্যকর প্রকল্প, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের উদ্যোগে রূপ দেওয়া গেলে ইউএনজিএর কূটনৈতিক যোগাযোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে আরও দৃশ্যমান ফল বয়ে আনতে পারে।
টিই/এমকে