আনইয়েমেনের হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার মধ্যেই সেনাদের কঠোর বার্তা দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা গ্র্যান্ড মুফতি শেখ সালেহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান। প্রয়োজনে দেশ রক্ষায় জীবন উৎসর্গের জন্য প্রস্তুত থাকতে সৌদি সেনাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
হুতিদের ক্ষমতা থেকে সরানো এবং ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন গ্র্যান্ড মুফতি। বৃহস্পতিবার রাতে সৌদি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থায় তার এই বার্তা প্রকাশ করা হয়।
সেনাদের প্রতি কঠোর বার্তা
সৌদি আরবের সীমান্তে মোতায়েন সেনাদের উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় গ্র্যান্ড মুফতি কুরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং আত্মত্যাগ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সংগ্রামসংক্রান্ত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণী উদ্ধৃত করেন।
তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা ও ভূখণ্ড রক্ষা করা এবং দেশের কোনো অংশে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রয়োজনে জীবন ও প্রাণ উৎসর্গ করা যেতে পারে।
গ্র্যান্ড মুফতির ভাষায়, ‘এই মহান দেশকে রক্ষা করা এবং এই ভূখণ্ডের এক ইঞ্চি জায়গাতেও হাত দেওয়ার চেষ্টা করা যে কাউকে শাস্তি দেওয়া—এগুলোর জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে জীবন ও প্রাণ উৎসর্গ করা যায়।’
হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদারের ইঙ্গিত
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিযোগ রয়েছে।
জবাবে সৌদি আরবও ইয়েমেনে বিমান হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব তাদের সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে মিলে হুতিদের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা করছে।
এই পরিস্থিতিতে গ্র্যান্ড মুফতির এমন বক্তব্যকে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের অবস্থান আরও কঠোর হওয়ার একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘দায়িত্ব পালনে সবসময় প্রস্তুত থাকুন’
সামনের সারিতে দায়িত্ব পালনরত সৌদি সেনাদের উদ্দেশে গ্র্যান্ড মুফতি দায়িত্ব পালনে সর্বদা প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সম্মুখসারিতে দায়িত্বরত ভাইয়েরা, আপনাদের ওপর আবশ্যিক কর্তব্য হলো—সর্বদা নিজেদের দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত থাকা, শাসক ও মাঠপর্যায়ের কমান্ডারদের আদেশ মেনে চলা এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্দেশাবলি বাস্তবায়ন করা।’
তিনি আরও বলেন, সৌদি সেনারা মহানবী (সা.)-এর সাহাবিদের পথ অনুসরণ করছেন এবং মুসলমানদের পবিত্র স্থানগুলো রক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন।
ইয়েমেনে বড় ধাক্কা সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর
হুতিদের সঙ্গে চলমান সংঘাতে সম্প্রতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে হুতিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব নৌপথের নিয়ন্ত্রণ হারায় তারা।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ হারানো সৌদি আরবের জন্যও বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ ইয়েমেনে হুতিদের মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে।
২০১৫ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে হুতিদের উৎখাতের লক্ষ্যে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান শুরু হয়। তবে সেই অভিযান প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়েছে।
আবারও উত্তপ্ত ইয়েমেন
ইয়েমেনের সাম্প্রতিক লড়াই দেশটির দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রায় ১২ বছর ধরে চলা এই সংঘাত ২০২২ সালের পর কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবারও লড়াই তীব্র হয়েছে। এর সঙ্গে ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতেরও যোগসূত্র তৈরি হয়েছে।
ফলে ইয়েমেনের পরিস্থিতি শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গেও তা ক্রমেই যুক্ত হয়ে পড়ছে।
হুতিদের পরাজয়ের জন্য প্রার্থনা
গ্র্যান্ড মুফতি তার বক্তব্যে সৌদি সেনাদের জন্য আল্লাহর সহায়তা কামনা করেন। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও ইয়েমেনকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য প্রার্থনা করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আপনাদের সকলকে তার সহায়তা প্রদান করেন এবং আমাদের দেশ ও প্রিয় ইয়েমেনকে সকল প্রকার ক্ষতি থেকে রক্ষা করেন।’
হুতি গোষ্ঠী এবং তাদের সহায়তা ও সমর্থনকারীদের সম্পূর্ণ পরাজয়ের জন্যও প্রার্থনা করেন তিনি।
ধর্মীয় আবহে হুতিবিরোধী অবস্থান জোরদার
সৌদি আরবের এই শীর্ষ ধর্মীয় নেতার বক্তব্য দেশটির রক্ষণশীল সুন্নি মুসলিম সমাজে হুতিদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিরূপ অবস্থান আরও জোরদার করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি মসজিদে হুতিদের হামলার ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। পাশাপাশি পবিত্র নগরী মক্কাকে লক্ষ্য করে হুতিরা হামলা চালিয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
সব মিলিয়ে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার উত্তেজনা এখন সামরিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিসরেও আরও গভীর হচ্ছে। গ্র্যান্ড মুফতির সর্বশেষ বক্তব্য সেই উত্তেজনার মধ্যেই সৌদি সেনাদের মনোবল ধরে রাখা এবং হুতিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানকে আরও জোরালো করার বার্তা হিসেবে সামনে এসেছে।
সন্ধানী বার্তা/জেএন