এক্সক্লুসিভ

স্থানীয় নির্বাচনে নতুন হিসাব সমান, মাঠ পেলেই ভোটে যাবে বাম

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে মাঠ গোছাতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। জাতীয় নির্বাচনের পর এবার স্থানীয় পর্যায়ের ভোটকে ঘিরে সক্রিয় হচ্ছে বাম দলগুলোও। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে তাদের অবস্থান ইতিবাচক। তবে সেই আগ্রহের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে স্পষ্ট শর্ত—নির্বাচনের মাঠ হতে হবে সবার জন্য সমান, পরিবেশ হতে হবে অবাধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।

বাম দলগুলোর নেতারা মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন তাদের জন্য শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের লড়াই নয়; দীর্ঘদিনের তৃণমূল সংগঠন যাচাই, নেতাকর্মীদের সক্রিয় করা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোরও সুযোগ। জাতীয় রাজনীতির বাইরে স্থানীয় ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্র হিসেবেও তারা এই নির্বাচনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

  • তৃণমূলে সংগঠন ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেখছে বাম দলগুলো
  • তবে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, ভোটারের নিরাপত্তা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমান
  • সুযোগ নিশ্চিত না হলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাবে না তারা

তৃণমূলে শক্তি যাচাইয়ের সুযোগ
ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে বাম দলগুলোর কৃষক, শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনের দীর্ঘদিনের কার্যক্রম রয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এসব সংগঠনের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদার করতে চাইছে দলগুলো।

জাতীয় নির্বাচনে যে রাজনৈতিক বক্তব্য বড় পরিসরে জায়গা পায়, স্থানীয় নির্বাচনে তার বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয় ভিন্নভাবে। রাস্তা, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কৃষি, কর্মসংস্থান, স্থানীয় উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার মতো বিষয় সামনে রেখে প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে যেতে পারবেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে দলগুলোর প্রকৃত সাংগঠনিক শক্তি কতটা, সেটিও স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

দলীয় প্রতীক নেই, প্রার্থীই মুখ
এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না করার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। খসড়া বিধিমালায় দলীয় মনোনয়ন বা প্রতীকের পরিবর্তে ব্যক্তিগত পরিচয়ে প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক পরিচয় এবং সাংগঠনিক সক্ষমতার গুরুত্ব বাড়তে পারে। বাম দলগুলোর জন্য এটি একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে কঠিন পরীক্ষা। দলীয় প্রতীক ভোটারের কাছে পরিচিতি তৈরির সুবিধা দেবে না; তাই প্রার্থীকে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় এবং স্থানীয় সংগঠনের শক্তির ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে।

শর্ত একটাই—সমান মাঠ
বাম দলগুলোর নেতাদের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে নির্বাচনী পরিবেশ। তাদের মতে, শুধু বিধিমালা তৈরি করলেই হবে না; মাঠে তার সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। সব প্রার্থীকে সমানভাবে প্রচারের সুযোগ দিতে হবে। ভোটার যেন কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা চাপ ছাড়াই কেন্দ্রে যেতে পারেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তবে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত কঠিন হবে।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের উপদেষ্টা খালেকুজ্জামানও নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে অবস্থান জানিয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, ভোটার স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন এবং প্রার্থীরা ভয়ভীতি ছাড়া প্রচার করতে পারবেন—এমন পরিবেশ থাকা জরুরি।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক বাম দল
স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে বাম দলগুলোর আগ্রহ থাকলেও অতীতের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা তাদের সতর্ক করেছে। তাই তফসিল ঘোষণার পর মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে তারা।

গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু বলেন, তাদের কাছে নির্বাচন শুধু ভোটের দিনের বিষয় নয়। মনোনয়ন, প্রচার, ভোটগ্রহণ এবং ফল ঘোষণা—প্রতিটি ধাপেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করার সক্ষমতা মাঠে প্রমাণ করতে হবে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের দল অংশ নেবে এবং সে লক্ষ্যে স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, নির্বাচনকে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করা হলে অংশগ্রহণের অর্থ থাকে না। অর্থবল, পেশিশক্তি ও প্রশাসনিক প্রভাব যাতে কোনো প্রার্থী কাজে লাগাতে না পারেন, সেটি নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে।

কমিশনের সামনে আস্থার পরীক্ষা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালা ও আচরণবিধি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার—ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন—নিয়ে বিধিমালা সংস্কারের কাজ চলছে।প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, কমিশন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে চায়। রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা ছাড়া নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। বাম দলগুলোর বক্তব্যে অবশ্য স্পষ্ট, তাদের কাছে কমিশনের বক্তব্যের চেয়ে মাঠের বাস্তবতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিধিমালায় নিরপেক্ষতার কথা লেখা থাকলেই হবে না, প্রয়োগেও তার প্রতিফলন দেখতে চায় তারা।

ভোটে যাবে বাম, তবে মাঠ দেখে
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বাম দলগুলোর অবস্থান এখন পর্যন্ত ইতিবাচক। তারা নির্বাচন বর্জনের পথে যেতে চায় না; বরং তৃণমূল রাজনীতিতে নিজেদের সংগঠন ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবেই ভোটকে দেখছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর—সমান নির্বাচনী সুযোগ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটারের নির্বিঘ্ন অংশগ্রহণ।

অর্থাৎ বাম দলগুলোর কাছে এবার স্থানীয় নির্বাচন শুধু প্রার্থী দাঁড় করানোর বিষয় নয়; এটি হবে নির্বাচনী পরিবেশ ও নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি—দুইয়েরই পরীক্ষা। মাঠ যদি সত্যিই সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে, তাহলে বাম দলগুলো প্রার্থী দেবে এবং সক্রিয়ভাবে ভোটের লড়াইয়ে নামবে। আর নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হলে তাদের অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তও সেই বাস্তবতার ওপরই নির্ভর করবে।

সন্ধানী বার্তা/এএইচ/এমএইচএ


সম্পর্কিত খবর