দারিদ্র্য কমানোর নামে পাঁচ দশক আগের দুটি মডেলকে নতুন করে সামনে আনা হয়েছে। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) প্রস্তাবিত ৫৭৩ কোটি ২১ লাখ টাকার প্রকল্পে ১৯৬০-এর দশকের ‘কুমিল্লা মডেল’ এবং ১৯৭০ সালের দক্ষিণ কোরিয়ার ‘সেমাউল’ মডেলের সমন্বয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দারিদ্র্য কমানোর সরাসরি কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, বিদেশ সফর, ভবন ও সরঞ্জাম কেনায় বিপুল অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—দারিদ্র্য কমানোর প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত কতটা মানুষের আয় বাড়াবে, আর কতটা অর্থ ব্যয় হবে প্রকল্প পরিচালনার অবকাঠামোতেই?
পুরোনো মডেলেই নতুন প্রকল্প
পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের উদ্যোগে প্রস্তাবিত ‘সেমাউল প্লাস অ্যান্ড পোভার্টি প্রোগ্রাম’ (এসপিইপিপি) প্রকল্পটির মেয়াদ আট বছর ছয় মাস। কুমিল্লা, ফেনী ও বগুড়ায় পরীক্ষামূলকভাবে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। বার্ড ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
প্রকল্প নথিতে বলা হয়েছে, সেমাউল মডেলের পরিশ্রম, আত্মনির্ভরতা ও সহযোগিতার সঙ্গে কুমিল্লা মডেলের সমবায়, সঞ্চয়, তদারকির মাধ্যমে ঋণ, স্থানীয় পরিকল্পনা ও কৃষি সম্প্রসারণের ধারণা যুক্ত করা হবে। সরাসরি সহায়তা বা প্রশিক্ষণ পাবেন ১০ হাজারের বেশি মানুষ। প্রায় ২২ হাজার ৮০০ পরিবারকে বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে, ছয় দশক আগের কুমিল্লা কিংবা পাঁচ দশক আগের কোরিয়ার অভিজ্ঞতা বর্তমান বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে কতটা কার্যকর হবে।
বদলে যাওয়া বাস্তবতায় পুরোনো সমাধান
অর্থনীতিবিদদের মতে, সেই সময়ের গ্রাম আর এখনকার গ্রাম এক নয়। তখন যোগাযোগ ও বাজারব্যবস্থা সীমিত থাকায় গ্রামীণ অর্থনীতি ছিল অনেকটাই স্থানীয়। এখন সড়ক যোগাযোগ, মোবাইল প্রযুক্তি, ডিজিটাল লেনদেন ও বাজার সম্প্রসারণের ফলে কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত।
এই বাস্তবতায় শুধু সমবায়, সঞ্চয়, স্থানীয় নেতৃত্ব কিংবা আত্মনির্ভরতার পুরোনো ধারণা দিয়ে দারিদ্র্য কমানোর কৌশল তৈরি করলে বর্তমান অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মূল্য সংযোজন ও গ্রামীণ বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো বিষয়কে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বার্ডের পরিচালক ড. শেখ মাসুদুর রহমান অবশ্য বলছেন, পুরোনো কোনো মডেল হুবহু অনুসরণ করা হবে না। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কুমিল্লা ও সেমাউল মডেলের কার্যকর উপাদান ব্যবহার করা হবে। ২০২৬ সালের বাস্তবতায় ‘সেমাউল প্লাস’কে আধুনিক করে বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রশিক্ষণেই ৮৯ কোটি টাকা
প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে প্রশিক্ষণ খাত। ১০৪ কর্মকর্তাকে দক্ষিণ কোরিয়ায় ১২ ব্যাচে প্রশিক্ষণ দিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। দেশে ৩৮৬ ব্যাচের প্রশিক্ষণে আরও ৭৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অর্থাৎ দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণ মিলিয়ে প্রায় ৮৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
প্রশ্ন উঠেছে, গ্রামীণ দারিদ্র্য কমানোর প্রকল্পে এত বিপুল অর্থ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে ব্যয় করা কতটা প্রয়োজনীয়। বিশেষ করে যে মডেল অনুসরণ করার কথা বলা হচ্ছে, তার মৌলিক ধারণাগুলো নিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বহু বছর ধরে কাজ হচ্ছে।
৬১ কোটি টাকার প্রশিক্ষণকেন্দ্র
প্রশিক্ষণ খাতের বড় বরাদ্দের পাশাপাশি কুমিল্লায় একটি ‘এসপিইপিপি প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ নির্মাণে ৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১০ দশমিক ৭১ শতাংশই যাবে এই স্থাপনায়।
প্রশ্নটি আরও জোরালো হয় যখন দেখা যায়, প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি আলাদা করে ৬১ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ১০টি কৃষিপণ্য সংগ্রহকেন্দ্র নির্মাণেও ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
অনুদান, গাড়ি ও সরঞ্জামেও বড় বরাদ্দ
কমিউনিটি অবকাঠামো ও অকৃষি ব্যবসায় ৭৩ কোটি ৩৮ লাখ এবং কৃষি উপকরণ, কৃষি প্রকল্প ও অবকাঠামোয় প্রায় ৫৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। দুই খাতে অনুদানের পরিমাণ প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে অফিস সরঞ্জাম ও যানবাহন। প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অফিস সরঞ্জামে ১৮ কোটি ৫৫ লাখ, তিনটি জিপে প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ এবং ৪১টি মোটরসাইকেলে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
অর্থাৎ প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও অনুদান—এই কয়েকটি খাতেই ব্যয় প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। দারিদ্র্য কমানোর মূল কার্যক্রমের তুলনায় প্রকল্প পরিচালনার সক্ষমতা তৈরিতে ব্যয়ের এই ভারসাম্য নিয়েই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।
আগের প্রকল্পের ব্যর্থতার শিক্ষা?
নতুন প্রকল্পের নথিতেই আগের একটি প্রকল্পের টেকসই না হওয়ার কারণ উল্লেখ রয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ২০টি গ্রামে ‘বার্ড-কোইকা’ প্রকল্পে রাস্তা, স্কুল, পানি সুবিধা, কমিউনিটি সেন্টার ও জীবিকা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু বিদেশি অনুদান শেষ হওয়ার পর দুর্বল নজরদারি, স্থানীয় সরকারের কম মালিকানা এবং গ্রাম সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ায় কার্যক্রম টেকসই হয়নি।
এই অভিজ্ঞতার পরও নতুন প্রকল্পে বড় ব্যয়ে ভবন, বিদেশ প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা প্রশ্ন তুলছে—আগের প্রকল্প টেকসই না হওয়ার যে কারণগুলো নথিতেই চিহ্নিত হয়েছে, নতুন প্রকল্পে সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হবে?
ব্যয়ের বিষয়ে বার্ডের পরিচালক ড. শেখ মাসুদুর রহমান বলেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেই ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা সভায় ব্যয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী প্রকল্পটি পুনর্গঠন করে পাঠানো হবে।
শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্পের সাফল্যের মাপকাঠি হবে ভবন, প্রশিক্ষণ বা বিদেশ সফরের সংখ্যা নয়। বরং প্রকল্প শেষে কত মানুষের আয় বেড়েছে, কত কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এবং অনুদান-নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় উদ্যোগ কতটা টেকসই হয়েছে—সেখানেই ৫৭৩ কোটি টাকার বিনিয়োগের আসল পরীক্ষা।
এম/এএইচ