তথ্যপ্রযুক্তি

মহাবিশ্বে নতুন মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান, বাংলাদেশি গবেষক মুস্তাফা

মহাবিশ্বের অজানা রহস্য উন্মোচনে নতুন এক শ্রেণির মহাজাগতিক উৎস শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশি গবেষক মুস্তাফা মুহিবুল্লাহ। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Center for Astrophysics (CfA) | Harvard & Smithsonian-এর যৌথ গবেষণায় শনাক্ত এসব উৎসের নাম দেওয়া হয়েছে Hypersoft X-ray Sources (HSS)।

আন্তর্জাতিক গবেষণা দলের নেতৃত্বে ছিলেন কাপ্তাই উপজেলার কর্ণফুলী পেপার মিলস (কেপিএম) স্কুলের ২০০৭ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী মুস্তাফা মুহিবুল্লাহ। তিনি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন।

গবেষণায় তাঁর পিএইচডি সুপারভাইজার ড. জিমি আরউইন এবং CfA-এর ড. রোজান ডি স্টেফানো পরামর্শক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

৬ গ্যালাক্সিতে ৮৪টি উৎস শনাক্ত

মুস্তাফা মুহিবুল্লাহ জানান, নাসার Chandra X-ray Observatory-এর দীর্ঘদিনের সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করে ছয়টি গ্যালাক্সিতে মোট ৮৪টি HSS উৎস শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পৃথিবীর নিকটতম বড় গ্যালাক্সি Andromeda (M31)-তে ২১টি এবং প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ আলোকবর্ষ দূরের Pinwheel Galaxy (M101)-তে সাতটি HSS পাওয়া গেছে।

গবেষণার ফল আরও নির্ভরযোগ্য করতে নাসার Hubble Space Telescope এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ESA-এর XMM-Newton পর্যবেক্ষণের তথ্যও ব্যবহার করেছেন গবেষকেরা।

এতদিন অদৃশ্য ছিল কেন?

গবেষকদের মতে, HSS অত্যন্ত কম শক্তির এক্স-রে বিকিরণ করে। ফলে প্রচলিত পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে এসব উৎস শনাক্ত করা কঠিন। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো বিপুল পরিমাণে Extreme Ultraviolet (EUV) বা চরম অতিবেগুনি রশ্মি নির্গত করে।

তবে পৃথিবী থেকে EUV সরাসরি শনাক্ত করা কঠিন। কারণ মিল্কিওয়ে ছায়াপথের আন্তঃনাক্ষত্রিক হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস EUV বিকিরণের বড় অংশ শোষণ করে নেয়। তাই গবেষকেরা সরাসরি EUV শনাক্ত না করে এর সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষীণ ও কম শক্তির এক্স-রে বিকিরণ বিশ্লেষণ করে HSS-এর অস্তিত্ব শনাক্ত করেছেন।

HSS আসলে কী?

গবেষকদের ধারণা, HSS কোনো একক ধরনের মহাজাগতিক বস্তু নয়। এগুলো মূলত দ্বৈত নক্ষত্রব্যবস্থা, যেখানে দুটি ঘন নক্ষত্র পরস্পরকে কেন্দ্র করে ঘোরে। এসব ব্যবস্থায় শ্বেত বামন, নিউট্রন স্টার কিংবা কৃষ্ণগহ্বর থাকতে পারে।

এই আবিষ্কারের মাধ্যমে Type Ia Supernova-এর উৎস সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা জানতে চেষ্টা করছেন, টাইপ Ia সুপারনোভা বিস্ফোরণের আগে সংশ্লিষ্ট নক্ষত্রব্যবস্থা কেমন থাকে। HSS-এর বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নতুন পথ খুলে দিতে পারে।

এ ছাড়া HSS থেকে নির্গত শক্তিশালী EUV বিকিরণ গ্যালাক্সির আন্তঃনাক্ষত্রিক হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামকে আয়নিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে গ্যালাক্সির গ্যাসের আয়নীকরণ প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রেও গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

আরও অনেক HSS-এর সন্ধান মিলতে পারে

মুস্তাফা মুহিবুল্লাহর মতে, এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া ৮৪টি HSS মহাবিশ্বে থাকা মোট সংখ্যার খুব সামান্য অংশ হতে পারে। ভবিষ্যতে আরও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অনেক নতুন HSS শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এসব উৎসের বিস্তারিত গবেষণা মহাবিশ্বের অতিবেগুনি বিকিরণের উৎস, গ্যালাক্সির আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাসের আয়নীকরণ এবং ঘন মহাজাগতিক বস্তুর বিবর্তন সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে পারে। পাশাপাশি Type Ia Supernova নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

কাপ্তাইয়ের কেপিএম স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী মুস্তাফা মুহিবুল্লাহর নেতৃত্বে এই আন্তর্জাতিক গবেষণা বাংলাদেশের তরুণদের মহাকাশ ও মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণায় আগ্রহী হওয়ার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

সন্ধানী বার্তা/এসএ


সম্পর্কিত খবর