ম্যাকলমোরকে নিজের চলমান ‘লুপ ট্যুর’ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় তুমুল বিতর্কের মধ্যে অবশেষে মুখ খুলেছেন ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী এড শিরান। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় শনিবারের কনসার্টে মঞ্চে উঠে এ বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। শিরান জানান, কখনোই নিজেকে ‘অ্যাকটিভিস্ট মিউজিশিয়ান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। তবে বর্তমান মানবিক সংকট তাঁকে নীরব থাকার সুযোগ দিচ্ছে না।
ফিলাডেলফিয়ার কনসার্টে দর্শকদের উদ্দেশে শিরান বলেন, তিনি তাঁর ক্যারিয়ারে রাজনৈতিক ভাষ্যকারের ভূমিকা নিতে চাননি। তাঁর কাছে গান ও কনসার্ট হওয়া উচিত ঐক্যের জায়গা। কিন্তু গাজায় চলমান পরিস্থিতিকে তিনি মানবিক সংকট হিসেবে দেখছেন এবং এ বিষয়ে নিজের অনুভূতি আর গোপন রাখতে পারছেন না।
বিতর্কের সূত্রপাত সেপ্টেম্বরের শুরুতে। গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে একটি মঞ্চ পরিবেশনায় ম্যাকলমোর সেখানকার পরিস্থিতিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানান। এর পরই এড শিরানের ‘লুপ ট্যুর’ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
তবে শিরান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর নয়। সফরের আয়োজক মেসিনা ট্যুরিং গ্রুপই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান তিনি। আয়োজকদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ভেন্যু ম্যাকলমোরকে নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। এর মধ্যে ম্যাসাচুসেটসের গিলেট স্টেডিয়ামও ছিল।
গিলেট স্টেডিয়ামের মালিক ও নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের কর্ণধার রবার্ট ক্র্যাফটও ম্যাকলমোরের পারফরম্যান্স বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি ম্যাকলমোরের বক্তব্যকে ‘হেট স্পিচ’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং অভিযোগ করেন, তাঁর বক্তব্যে হামাসের কর্মকাণ্ডের বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে।
ম্যাকলমোরের পক্ষে শিল্পীদের সরে দাঁড়ানো
ম্যাকলমোরকে সফর থেকে বাদ দেওয়ার পর এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কয়েকজন শিল্পীও ‘লুপ ট্যুর’ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আইরিশ গায়ক-গীতিকার অ্যারন রো এবং ড্যানিশ সংগীতশিল্পী লুকাস গ্রাহাম ও তাঁর ব্যান্ডের সদস্যরা।
তাঁদের বক্তব্য, ম্যাকলমোরকে সফর থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা শিল্পীদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে শনিবারের কনসার্টে শিরান স্বীকার করেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তাঁকে কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এ নিয়ে ভুল হয়ে থাকলে তার জন্য দুঃখও প্রকাশ করেন তিনি।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন নিয়ে শিরানের বক্তব্য
ফিলাডেলফিয়ার মঞ্চে শিরান ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে চালানো হামলাকে তিনি ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে গাজায় চলমান পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়কর, অযৌক্তিক ও অসমানুপাতিক’ বলে মন্তব্য করেন।
শিরানের ভাষায়, ইসরায়েলে ৭ অক্টোবরের হামলা ভয়াবহ ছিল এবং ইহুদি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের যন্ত্রণাকে আরও গভীর করেছে।
গাজার পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, সেখানে ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। পশ্চিম তীরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটিও উপেক্ষা করা যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে একই সঙ্গে এ বিষয়ে তাঁর জ্ঞান সীমিত বলেও স্বীকার করেছেন শিরান। তিনি জানান, কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের উপকারে আসা যায়, তা বোঝার চেষ্টা করছেন এবং এ বিষয়ে তিনি শুনছেন ও শিখছেন।
‘আমি জানতাম না সফর চলবে কি না’
ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রভাব যে তাঁর ওপরও পড়েছে, সেটি কনসার্টে স্বীকার করেন শিরান।
দর্শকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একপর্যায়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না ‘লুপ ট্যুর’ আদৌ চলবে কি না। এমনকি শিল্পী হিসেবে আবার মঞ্চে ফিরতে চান কি না, তা নিয়েও সংশয়ে ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ভক্তদের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা মাথায় রেখে তিনি মঞ্চে ফিরেছেন।
শিরান আরও বলেন, তাঁর কনসার্ট এমন একটি জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে সবাই স্বাগত এবং ভিন্নমতের মানুষও পাশাপাশি দাঁড়াতে পারেন।
কনসার্টের বাইরে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ
শিরানের বক্তব্যের মধ্যেই ফিলাডেলফিয়ার কনসার্টের বাইরে বিক্ষোভও হয়েছে। কয়েকজন বিক্ষোভকারী ফিলিস্তিনের পতাকা নিয়ে অবস্থান নেন। তাঁদের একজন বিবিসিকে বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানাতেই তাঁরা সেখানে এসেছেন।
তাঁদের মতে, ম্যাকলমোরের মতো শিল্পীদের নিজস্ব মঞ্চ ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিদের কথা বলার সুযোগ থাকা উচিত।
অন্যদিকে কনসার্টে আসা কয়েকজন দর্শক জানান, তাঁরা সংগীত উপভোগের পাশাপাশি শিল্পীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও গুরুত্ব দেন।
বিতর্কের মধ্যেই এড শিরানের ‘লুপ ট্যুর’-এর বাকি আয়োজন উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় চলবে। তবে বিতর্কের প্রভাব টিকিট বিক্রিতেও পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফিলাডেলফিয়ার কনসার্টের কিছু টিকিটের দাম ৩২ ডলার পর্যন্ত নেমে আসে। কিছু দর্শক টিকিটের অর্থ ফেরত পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন। যদিও টিকিটমাস্টার ও মেসিনা ট্যুরিং গ্রুপ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি।
সূত্র: বিবিসি
সন্ধানী বার্তা/এসএ