১৯১২ সালে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে যাওয়া ব্রিটিশ যাত্রীবাহী জাহাজ আরএমএস টাইটানিকের সঙ্গে কানাডার পূর্বাঞ্চলীয় শহর হ্যালিফ্যাক্সের রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার করা বহু মরদেহ এই শহরে আনা হয়েছিল। বর্তমানে হ্যালিফ্যাক্সের তিনটি সমাধিক্ষেত্রে টাইটানিক দুর্ঘটনায় নিহত প্রায় ১৫০ জন যাত্রী চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।
১৯১২ সালের ১০ এপ্রিল প্রথম যাত্রায় টাইটানিক দুই হাজারের বেশি যাত্রী ও ক্রু নিয়ে রওনা হয়। চার দিন পর, ১৪ এপ্রিল মধ্যরাতের কিছু আগে, উত্তর আটলান্টিকে একটি হিমশৈলের সঙ্গে ধাক্কা লাগে জাহাজটির। তিন ঘণ্টারও কম সময়ে জাহাজটি ডুবে যায়। এতে প্রায় দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। পরে কার্পাথিয়া জাহাজে উদ্ধার হওয়া জীবিত যাত্রীদের নিউইয়র্কে নেওয়া হয়।
দুর্ঘটনার পর মৃতদেহ উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় হ্যালিফ্যাক্স। দুর্ঘটনাস্থলের তুলনামূলক কাছাকাছি বড় বন্দর, রেল ও টেলিগ্রাফ যোগাযোগের সুবিধা থাকায় উদ্ধার করা মরদেহগুলো এই শহরে আনা হয়। হোয়াইট স্টার লাইন চারটি কানাডীয় জাহাজকে মরদেহ উদ্ধারের কাজে নিয়োগ করেছিল। এর মধ্যে হ্যালিফ্যাক্স থেকে যাত্রা করা সিএস ম্যাকে-বেনেট ছিল প্রথম জাহাজ।
চারটি জাহাজ মিলে মোট ৩২৮টি মরদেহ উদ্ধার করে। তাঁদের অনেককে সমুদ্রেই সমাহিত করা হয়। বাকিদের হ্যালিফ্যাক্সে আনা হয়। পোশাক, গয়না, চিঠি ও অন্যান্য ব্যক্তিগত সামগ্রীর মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জনকে ফেয়ারভিউ লন, মাউন্ট অলিভেট ও ব্যারন হির্শে—এই তিন সমাধিক্ষেত্রে দাফন করা হয়।
টাইটানিকের স্মৃতি শুধু এসব সমাধিক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। হ্যালিফ্যাক্সের মেরিটাইম মিউজিয়াম অব আটলান্টিকে রয়েছে টাইটানিকের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ। জাদুঘরের স্থায়ী প্রদর্শনী ‘টাইটানিক: দ্য আনসিঙ্কেবল শিপ অ্যান্ড হ্যালিফ্যাক্স’-এ জাহাজটির নির্মাণ, দুর্ঘটনা এবং পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
প্রদর্শনীতে রয়েছে ৫০টির বেশি বস্তু, ঐতিহাসিক আলোকচিত্র ও নথি। এর মধ্যে রয়েছে টাইটানিকের আসল ডেক চেয়ার, জাহাজ থেকে উদ্ধার করা কাঠের বিভিন্ন অংশ এবং অন্যান্য নিদর্শন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি ছোট চামড়ার জুতা। এটি টাইটানিকের ‘অজানা শিশু’র সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিশ্বাস করা হয়। দুর্ঘটনার পর ম্যাকে-বেনেটের নাবিকেরা যে অজ্ঞাত শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছিলেন, তাকে ফেয়ারভিউ লন কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরে ডিএনএ গবেষণায় শিশুটিকে ১৯ মাস বয়সী সিডনি লেসলি গুডউইন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। জাদুঘরে রাখা জুতাজোড়াটি সেই শিশুটির বলে বিশ্বাস করা হয়।
জাদুঘরের সংগ্রহে টাইটানিক থেকে ভেসে আসা কাঠের অংশও রয়েছে। দুর্ঘটনার পর স্থানীয় জেলে ও নাবিকেরা সমুদ্র থেকে এসব কাঠ সংগ্রহ করেছিলেন। পরে বিভিন্ন পরিবার সেগুলো দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে এবং এর কিছু অংশ জাদুঘরে দান করা হয়।
প্রদর্শনীতে টাইটানিকের যাত্রীদের জীবনযাত্রার নানা দিকও তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম শ্রেণির বিলাসবহুল যাত্রী, তৃতীয় শ্রেণির অভিবাসী এবং জাহাজের কর্মীদের জীবনচিত্রের মাধ্যমে সেই সময়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
টাইটানিকের ইতিহাস নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের সঙ্গেও এই জাদুঘরের যোগ রয়েছে। ১৯৯৭ সালের জেমস ক্যামেরনের ‘Titanic’ চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় ক্যামেরন জাদুঘরের টাইটানিক-সংক্রান্ত নিদর্শন দেখেছিলেন। চলচ্চিত্রটির গবেষণাতেও জাদুঘরের সংগ্রহ ও বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান কাজে লেগেছিল।
হ্যালিফ্যাক্সের তিন সমাধিক্ষেত্র ও মেরিটাইম মিউজিয়ামের নিদর্শনগুলো তাই টাইটানিক দুর্ঘটনার ইতিহাসকে শুধু বই বা সিনেমার গল্প হিসেবে নয়, বাস্তব মানুষের জীবন ও স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখার সুযোগ দেয়।
সন্ধানী বার্তা/এসএ