ইউক্রেন যুদ্ধ আরও জোরদার করতে রাশিয়া নতুন করে সেনা নিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাইবার হামলা, নাশকতা, ড্রোন হামলা ও তথ্যযুদ্ধসহ ‘হাইব্রিড’ তৎপরতা বাড়াতে পারে মস্কো—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচন শেষে ‘স্টেলথ মোবিলাইজেশন’ বা গোপন ও ধাপে ধাপে সেনা সমাবেশের প্রস্তুতি নেওয়া হতে পারে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও এর আগে দাবি করেছিলেন, নির্বাচনের পর রাশিয়া আরও প্রায় তিন লাখ সেনা নিয়োগ করতে পারে।
তবে মস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন করে তিন লাখ সেনা নিয়োগের কোনো পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, একবারে বিপুলসংখ্যক সেনা নিয়োগের পরিবর্তে ধাপে ধাপে জনবল বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে রাশিয়া। এর মধ্যে চুক্তিভিত্তিক সেনা নিয়োগ বাড়ানো এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ইউরোপে হাইব্রিড হামলার আশঙ্কা
ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাশিয়ার হাইব্রিড তৎপরতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ইউরোপীয় নেতারা। সাইবার হামলা, নাশকতা, ড্রোন হামলা, তথ্যযুদ্ধ এবং অন্যান্য গোপন কার্যক্রমকে সাধারণত এ ধরনের হুমকির আওতায় ধরা হয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমান্যুয়েল ম্যাক্রোঁ শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বলেছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ফ্রান্স ও ইউরোপের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হাইব্রিড হুমকি বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা শিল্পকে সম্ভাব্য নাশকতা থেকে সুরক্ষিত রাখতে পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
ম্যাক্রোঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন কমিয়ে আনতে ভয় দেখানোর কৌশল নিতে পারে রাশিয়া।
রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা নিয়ে পোল্যান্ডের সতর্কতা
রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা নিয়ে সতর্ক করেছেন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও। তাঁর দাবি, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইউক্রেনকে সমর্থনকারী ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হাইব্রিড হামলার পরিকল্পনা থাকতে পারে রাশিয়ার।
টাস্কের মতে, পোল্যান্ডও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। রাশিয়া কোনো হামলাকে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া এবং জোটের সংহতি পরীক্ষা করার চেষ্টা হতে পারে।
তিন লাখ সেনা নিয়োগের দাবি
ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কয়েক মাস ধরেই রাশিয়ার নতুন সেনা নিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক করে আসছে। গত আগস্টে জেলেনস্কি দাবি করেছিলেন, সেপ্টেম্বরের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর রাশিয়া অতিরিক্ত তিন লাখ সেনা নিয়োগ করতে পারে।
পরে ইউক্রেনের গোয়েন্দা ও বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দাবি করে, ২০২৬ ও ২০২৭ সালে মোট ছয় লাখ সেনা নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে মস্কোর।
তবে পশ্চিমা কর্মকর্তারা বলছেন, এত বিপুলসংখ্যক নতুন সেনাকে দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর মতো সামরিক সরঞ্জাম ও সক্ষমতা রাশিয়ার হাতে রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের ধারণা, প্রকাশ্য ও বড় আকারের গণনিয়োগের পরিবর্তে ধাপে ধাপে জনবল বাড়ানোর কৌশল নিতে পারে মস্কো।
ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ
এদিকে ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানোর সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ইউরোপ থেকে ২৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ খবর অস্বীকার করেছে।
এরই মধ্যে ন্যাটোর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইউরোপে মার্কিন সেনা মোতায়েন নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ইউরোপীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একাংশের আশঙ্কা, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার চলমান সামরিক অভিযান ভবিষ্যতে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর বিরুদ্ধেও আরও প্রকাশ্য পদক্ষেপের দিকে গড়াতে পারে।
ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনা নিয়ে রাশিয়ার হুমকি
ইউক্রেনকে দূরপাল্লার হামলায় সহায়তা করা হলে ইউক্রেনে থাকা ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনাগুলোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে হুমকি দিয়েছে মস্কো।
ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে অভিযোগ জানাতে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মস্কোয় ব্রিটিশ দূতাবাসের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিককে তলব করে। তবে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর এই পদক্ষেপকে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এর আগে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ১০ কোটি পাউন্ড সহায়তার ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাজ্য।
পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একাংশের মূল্যায়ন, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় অর্থবহ শান্তি আলোচনার পরিবর্তে সামরিক চাপ বাড়ানোর পথ বেছে নিতে পারে মস্কো। তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে নতুন করে বড় ধরনের সেনা সমাবেশ বা ইউরোপে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
সন্ধানী বার্তা/এসএ