ইসলামে মানুষের জীবনে সম্পদের পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্ক, আত্মীয়তার বন্ধন ও পরিবারের গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা আনফালের প্রথম আয়াতেও গনিমতের সম্পদ নিয়ে প্রশ্নের প্রসঙ্গে মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আয়াতটিতে বলা হয়েছে, গনিমতের সম্পদের বিষয়ে সিদ্ধান্তের এখতিয়ার আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের। এরপরই মুমিনদের আল্লাহকে ভয় করতে এবং নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক সংশোধন করতে বলা হয়েছে। লেখকের মতে, এই আয়াতের তাৎপর্য হলো—প্রশ্ন যখন সম্পদ নিয়ে, তখনও আল্লাহ সম্পর্ক ঠিক রাখার বিষয়টিকে সামনে এনেছেন।
আজকের সমাজে সম্পদকে সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে দেখা হলেও অর্থ ও সম্পদ মানুষের সব প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না। অর্থ দিয়ে বাড়ি, চিকিৎসা কিংবা প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনা যায়; কিন্তু পরিবারের ভালোবাসা, মা-বাবার দোয়া কিংবা আপনজনের সঙ্গ কেনা যায় না।
একজন মানুষের ব্যাংকে কোটি টাকা থাকতে পারে, জমিজমা ও বড় বাড়ি থাকতে পারে; কিন্তু মা-বাবা, ভাই-বোন কিংবা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে সেই সম্পদের মধ্যেও একাকিত্ব থেকে যেতে পারে। বিপরীতে সীমিত সম্পদের একজন মানুষ পরিবারের ভালোবাসা, আপনজনের সঙ্গ ও দোয়া নিয়ে জীবন কাটাতে পারেন।
সম্পদের আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো—হারানো মানুষকে তা ফিরিয়ে দিতে পারে না। একজন মা বা বাবা মারা গেলে পৃথিবীর কোনো সম্পদ তাঁকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। প্রিয় ভাই-বোন কিংবা অন্য কোনো স্বজনকে হারালেও অর্থ তাঁদের বিকল্প তৈরি করতে পারে না।
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকে সিলাতুর রাহিম বলা হয় এবং এ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই পরিবার ও আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, ধর্মীয়ভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
সুরা আনফালের প্রথম আয়াতের আলোচনায় লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন—বদর যুদ্ধের পর গনিমতের সম্পদ নিয়ে সাহাবিদের প্রশ্নের জবাবে প্রথমেই তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ সম্পদ কীভাবে বণ্টিত হবে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব অক্ষুণ্ন রাখা।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পদ মানুষের জীবনকে স্বচ্ছল করতে পারে, কিন্তু সম্পর্ক জীবনকে অর্থবহ করে। অর্থ দিয়ে বসবাসের জন্য ঘর তৈরি করা যায়, কিন্তু ভালোবাসা ছাড়া পরিবার তৈরি করা যায় না।
তাই মা-বাবা, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ককে অবহেলা না করে তাঁদের সময় দেওয়া, খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো জরুরি। সম্পদ হারালে তা আবার অর্জন করা সম্ভব হতে পারে; কিন্তু হারানো মানুষ ও ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক সব সময় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
লেখক: মুদাররিস, জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া ও প্রিন্সিপাল, মাদরাসাতুল কুরআন লিলবানাত।
সন্ধানী বার্তা/এসএ