শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি

ছদ্মনামে উপন্যাস লিখে স্প্যানিশ সাহিত্য পুরস্কার জিতলেন ইসাবেল আলেন্দে

ছদ্মনামে লেখা উপন্যাসের জন্য স্পেনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার ‘প্রেমিও প্লানেতা’ জিতেছেন চিলি-আমেরিকান প্রখ্যাত লেখক ইসাবেল আলেন্দে। তাঁর উপন্যাস লা ওরা আন্তেস দেল আলবা (La hora antes del alba)-এর জন্য তিনি পেয়েছেন ১০ লাখ ইউরো। সাহিত্যের জগতে দীর্ঘদিনের অবদানের পাশাপাশি এবার নিজের বহুল আলোচিত উপন্যাস দ্য হাউস অব দ্য স্পিরিটস-এর গল্পের ধারাবাহিকতা তুলে ধরেও আলোচনায় এসেছেন তিনি।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পুরস্কারটির ৭৫তম আসরে বিজয়ী হিসেবে আলেন্দের নাম ঘোষণা করা হয়। বার্সেলোনায় আয়োজিত পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফেলিপে ও রানি লেতিসিয়া উপস্থিত ছিলেন। ১০ লাখ ইউরোর এই পুরস্কারটি স্প্যানিশ ভাষার সাহিত্যে অন্যতম বড় আর্থিক পুরস্কার হিসেবে পরিচিত। ছদ্মনামে উপন্যাস লিখে এই সম্মাননা অর্জন করায় আলেন্দের নতুন বই এবং এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ঘিরে পাঠক ও সাহিত্যাঙ্গনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

‘দ্য হাউস অব দ্য স্পিরিটস’-এর গল্পে ফিরলেন আলেন্দে
ইসাবেল আলেন্দের নতুন উপন্যাসটি তাঁর ১৯৮২ সালে প্রকাশিত বিশ্বখ্যাত বই দ্য হাউস অব দ্য স্পিরিটস-এর ধারাবাহিকতা। আগের উপন্যাসের পরিচিত চরিত্রগুলোর জীবন ও অভিজ্ঞতাকে আবারও সামনে এনেছেন তিনি। কয়েক দশক ধরে পাঠকেরা জানতে চেয়েছেন, সেই উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আলবার জীবনে পরবর্তী সময়ে কী ঘটেছিল। পাঠকদের সেই কৌতূহলই নতুন বইটি লেখার অন্যতম অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, নতুন উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র আলবা এস্তেবান ত্রুয়েবা। সে ক্লারা দেল ভায়ের নাতনি। চিলিতে স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোশের শাসনামলে কারাবন্দি হওয়া ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আলবার জীবন এগিয়ে যায়। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে জীবন গড়ে তোলার চেষ্টা তার গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আলেন্দে জানিয়েছেন, নতুন উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি দ্য হাউস অব দ্য স্পিরিটস-এর গল্পের জগৎকে পূর্ণতা দিতে চান। পুরোনো চরিত্রের পরবর্তী জীবন তুলে ধরার পাশাপাশি ইতিহাস, রাজনৈতিক নিপীড়ন, স্মৃতি ও ব্যক্তিগত ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়গুলোও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।

পুরস্কার জিতে ‘নোবেল পাওয়ার মতো’ অনুভূতি
পুরস্কার জয়ের প্রতিক্রিয়ায় আলেন্দে বলেন, ‘এটি যেন নোবেল পুরস্কার জেতার মতো।’ তাঁর বক্তব্যে এই সম্মাননার গুরুত্ব এবং নিজের দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনে এমন স্বীকৃতি পাওয়ার আনন্দ ফুটে উঠেছে।

তিনি আরও বলেন, তিনি কখনো কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেননি। কারণ, প্রতিযোগিতায় সবার শেষে থাকার বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে চেয়েছেন। তবে বয়সের এই পর্যায়ে এসে হারানোর মতো খুব বেশি কিছু নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আলেন্দের এই বক্তব্য তাঁর স্বভাবসুলভ রসবোধের পরিচয় দেয়। দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি অর্জন করলেও প্রতিযোগিতামূলক পুরস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর অনীহার কথা আগে থেকেই আলোচনায় ছিল। এবার ছদ্মনামে লেখা উপন্যাসের জন্য পুরস্কার অর্জন তাঁর কর্মজীবনে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে।

ছদ্মনামে লেখার আড়ালে ইতিহাস ও ব্যক্তিগত স্মৃতি
নতুন উপন্যাসটি ছদ্মনামে লেখা হলেও এর বিষয়বস্তু আলেন্দের পরিচিত সাহিত্যিক জগতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে চিলির রাজনৈতিক ইতিহাস, কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিমানুষের জীবনে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রভাব তাঁর লেখায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র আলবার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কারাবন্দিত্ব, নির্যাতন এবং সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম উঠে এসেছে। এ ধরনের কাহিনি কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের বিবরণ নয়; বরং রাজনৈতিক সহিংসতা কীভাবে পরিবার, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে, সেটিও তুলে ধরে।

দ্য হাউস অব দ্য স্পিরিটস প্রকাশের পর থেকেই আলেন্দের সাহিত্যকর্মে ইতিহাস, পারিবারিক স্মৃতি, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। নতুন উপন্যাসে পুরোনো চরিত্রের গল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তিনি সেই ধারাকে আবারও সামনে এনেছেন।

গণতন্ত্রের সংকট ও কর্তৃত্ববাদের উত্থান নিয়ে উদ্বেগ
আলেন্দে তাঁর নতুন উপন্যাসের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতিরও মিল খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর মতে, বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের ওপর হুমকি, কর্তৃত্ববাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং ফ্যাসিবাদের উত্থান তাঁকে অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দেয়। লেখকের নিজের জীবনও চিলির রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ১৯৭৩ সালে অগাস্তো পিনোশের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দের সরকার উৎখাত হয়। এরপর ইসাবেল আলেন্দে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। সালভাদর আলেন্দে ছিলেন তাঁর বাবার চাচাতো ভাই।

পিনোশের শাসনামলে চিলিতে ব্যাপক রাজনৈতিক নিপীড়ন চালানো হয়। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ে আনুমানিক ৪০ হাজার মানুষ নির্যাতনের শিকার হন এবং তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা আলেন্দের ব্যক্তিগত জীবন ও সাহিত্যকর্মে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।

নির্বাসনের অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বসাহিত্যে প্রতিষ্ঠা
চিলির রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা আলেন্দের জীবনকে নতুন পথে পরিচালিত করে। নিজ দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর নির্বাসিত জীবনের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি এবং লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর লেখালেখির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে।

১৯৮২ সালে প্রকাশিত দ্য হাউস অব দ্য স্পিরিটস তাঁকে আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। উপন্যাসটিতে পারিবারিক ইতিহাস, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন একসঙ্গে উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্যকর্মও বিশ্বজুড়ে পাঠকের কাছে পরিচিতি লাভ করে। নতুন উপন্যাসের মাধ্যমে সেই পরিচিত জগতে ফিরে গিয়ে আলেন্দে একদিকে পুরোনো পাঠকদের দীর্ঘদিনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, অন্যদিকে অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতির সম্পর্কও সামনে এনেছেন।

প্রেমিও প্লানেতা জয়ে নতুন করে আলোচনায় আলেন্দে
বার্সেলোনায় আয়োজিত ৭৫তম প্রেমিও প্লানেতা পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে আলেন্দের বিজয় ঘোষণা আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ১০ লাখ ইউরোর পুরস্কারটি আর্থিক মূল্য ও মর্যাদার দিক থেকে স্প্যানিশ ভাষার সাহিত্যে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই অর্জনের তাৎপর্য শুধু অর্থমূল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিচিত উপন্যাসের ধারাবাহিকতা লেখা, রাজনৈতিক ইতিহাসকে সাহিত্যে রূপ দেওয়া এবং বর্তমান বিশ্বের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ—সব মিলিয়ে আলেন্দের নতুন বইটি তাঁর সাহিত্যিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে সামনে এসেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও রয়টার্স

সন্ধানী বার্তা/এএএন/এসএ


সম্পর্কিত খবর