ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় দুর্গাপূজার মণ্ডপে ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৫ জন। সপ্তমীর সন্ধ্যায় প্রবল বৃষ্টির মধ্যে মণ্ডপে প্রবেশের জন্য দর্শনার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হলে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও এসএসকেএম হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
শনিবার (১৮ অক্টোবর) রাতে কলকাতার চোরবাগান এলাকার একটি দুর্গাপূজার মণ্ডপে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে হতাহতের এ তথ্য জানানো হয়েছে। দুর্ঘটনার পর মণ্ডপের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে কাজ করেন পুলিশ ও দমকলকর্মীরা।
প্রবল বৃষ্টিতে মণ্ডপে প্রবেশের হুড়োহুড়ি
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সপ্তমীর সন্ধ্যায় কলকাতার চোরবাগান এলাকায় দুর্গাপূজার মণ্ডপ দেখতে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হয়েছিল। এ সময় হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে অনেক দর্শনার্থী মণ্ডপের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এতে প্রবেশপথে ভিড় বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে ঠেলাঠেলি শুরু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ভিড়ের মধ্যে কয়েকজন মাটিতে পড়ে গেলে তাঁদের পাশ দিয়ে থাকা অন্য দর্শনার্থীরাও ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান। এভাবে একের পর এক মানুষ পড়ে যাওয়ায় পদদলনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। ভিড়ের চাপে অনেকে বের হওয়ার সুযোগ পাননি বলেও অভিযোগ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশ।
দুর্গাপূজার মতো বড় জনসমাগমের অনুষ্ঠানে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে ভিড় নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় দর্শনার্থীরা একই সঙ্গে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করলে চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। চোরবাগানের ঘটনায় ঠিক কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
মণ্ডপের বৃত্তাকার চলাচলের পথেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির মণ্ডপের ভেতরে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে বের হওয়ার জন্য বৃত্তাকার চলাচলের পথ তৈরি করা হয়েছিল। সেই পথেই ভিড়ের চাপ তৈরি হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এবার মণ্ডপটির মূল ভাবনা ছিল ‘অরব’। শব্দের পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে নীরবতার গভীরে পৌঁছানোর ধারণাকে কেন্দ্র করে মণ্ডপটি সাজানো হয়েছিল। ব্যতিক্রমী এই আয়োজন দেখতে সপ্তমীর সন্ধ্যায় বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী সেখানে উপস্থিত হন।
তবে বৃত্তাকার চলাচলের পথের নকশা, প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থাপনা কিংবা নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পূজার অন্যতম উদ্যোক্তা বিকাশ দাস জানিয়েছেন, কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তা তাঁরা বুঝতে পারছেন না। আপাতত আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোই তাঁদের প্রধান কাজ বলে জানান তিনি।
সময়মতো নিরাপত্তা সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ
দুর্ঘটনার সময় উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের অভিযোগ, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলেও তাঁরা সময়মতো পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তা পাননি। তাঁদের দাবি, ভিড়ের মধ্যে কয়েকজন পড়ে যাওয়ার পর অন্যরাও তাঁদের ওপর পড়ে যান। এতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
তবে নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ধরনের অবহেলা ছিল কি না, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগের বিষয়ে তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বড় উৎসবের সময় বিপুল জনসমাগম সামাল দিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী, জরুরি বের হওয়ার পথ এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা ছিল কি না, সেসব বিষয়ও পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
হাসপাতালে আহতদের দেখতে মুখ্যমন্ত্রী
দুর্ঘটনার পর আহতদের দেখতে হাসপাতালে যান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার (১৮ অক্টোবর) রাতে তিনি আহতদের খোঁজখবর নেন এবং দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের আশ্বাস দেন। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ঘটনার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। মণ্ডপের দায়িত্বে কারা ছিলেন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা তদন্ত করা হবে। এ ছাড়া মণ্ডপে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
সিসিটিভি ফুটেজ থেকে দুর্ঘটনার আগে ও পরে ভিড়ের গতিবিধি, প্রবেশপথে চাপের মাত্রা এবং উদ্ধারকাজ শুরুর সময় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তদন্তে এসব তথ্যের পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
আহতদের উদ্ধার করে দুই হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে
দুর্ঘটনার পর মণ্ডপের আলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখা হয়, যাতে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা যায় এবং নতুন করে ভিড় না বাড়ে।
আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। পরে কয়েকজনকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। তবে তাঁদের সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাস্থলে পুলিশ ও দমকলকর্মীরা উদ্ধার ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কাজে অংশ নেন। এত বড় জনসমাগমের মধ্যে আহতদের দ্রুত সরিয়ে হাসপাতালে নেওয়া এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উদ্ধারকাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
তদন্তের নির্দেশ, নিহতদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস
দুর্ঘটনার পর ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। নিহতদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে রাজ্য সরকার। পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসা এবং দুর্ঘটনাসংক্রান্ত তথ্য জানার জন্য একটি টোল ফ্রি হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে।
তদন্তে মণ্ডপের নকশা, দর্শনার্থীদের চলাচলের পথ, নিরাপত্তাব্যবস্থা, বৃষ্টির সময় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হতে পারে। তবে তদন্তের ফল প্রকাশের আগে দুর্ঘটনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যবস্থাকে দায়ী করা যাচ্ছে না।
কলকাতার দুর্গাপূজা প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীকে আকর্ষণ করে। ফলে উৎসবের সময় ভিড় নিয়ন্ত্রণ, জরুরি নির্গমনপথ সচল রাখা এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চোরবাগানের এই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর জনসমাগমপূর্ণ পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা
সন্ধানী বার্তা/এএইচ/এসএ