বিনোদন

‘সেই তুমি’ থেকে ‘রুপালি গিটার’, আইয়ুব বাচ্চু আজও অমর সুরে

একটি গিটার, কয়েকটি তার আর আঙুলের জাদুতে যে অসংখ্য গল্প বলা যায়, তার অনন্য উদাহরণ আইয়ুব বাচ্চু। কখনো তাঁর গিটারের ঝংকারে জেগেছে বিদ্রোহ, কখনো বুকের গভীরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস সুর হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে শ্রোতাদের হৃদয়ে। মঞ্চে গিটার হাতে দাঁড়িয়ে যখন তিনি সুরের ঝড় তুলতেন, তখন দর্শক-শ্রোতারা শুধু গান শুনতেন না, বরং ডুবে যেতেন এক অনন্য সংগীতমগ্নতায়। সেই মানুষটির কাঁধে আজ আর গিটার ওঠে না, মঞ্চে শোনা যায় না তাঁর কণ্ঠ। তবু ‘রুপালি গিটার’ কিংবা ‘সেই তুমি’ বাজলেই মনে হয়, বাংলা গানের আকাশে তাঁর জন্য নির্ধারিত জায়গাটি আজও শূন্য।

২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর সকালে থেমে যায় বাংলা ব্যান্ডসংগীতের অন্যতম উজ্জ্বল এক অধ্যায়। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান আইয়ুব বাচ্চু। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে আট বছর। কিন্তু সময়ের ব্যবধান তাঁর গানকে ম্লান করতে পারেনি। ‘সেই তুমি’, ‘রুপালি গিটার’, ‘ফেরারি মন’ কিংবা ‘হাসতে দেখো, গাইতে দেখো’ বাজলেই মনে হয়, বাচ্চু ভাই যেন আজও আছেন—গিটারের তারে তারে, গানের প্রতিটি বাঁকে, শ্রোতাদের অনুভূতির গভীরে।

কৈশোর থেকে সংগীতের পথে যাত্রা
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্ম আইয়ুব বাচ্চুর। কৈশোরেই সংগীতের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। সেই আগ্রহ ধীরে ধীরে পরিণত হয় আজীবনের সাধনায়। সংগীতজীবনের শুরুর দিকে ফিলিংসের সঙ্গে পথচলার পর ১৯৮০ সালে তিনি যুক্ত হন সোলস ব্যান্ডে। সেখানে দীর্ঘ সময় লিড গিটারিস্ট হিসেবে কাজ করে নিজের দক্ষতা ও স্বতন্ত্র গিটারবাদনের ধরন গড়ে তোলেন।

সোলসে থাকাকালে গিটারবাদক হিসেবে পরিচিতি পেলেও বাচ্চুর স্বপ্ন ছিল আরও বড়। নিজের সংগীতভাবনা, সুরের বৈচিত্র্য এবং সৃজনশীলতাকে স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই ১৯৯১ সালে গড়ে তোলেন এলআরবি—লাভ রানস ব্লাইন্ড। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

এলআরবির মাধ্যমে বাচ্চু এমন এক সংগীতধারা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে রকসংগীতের শক্তি, ব্লুজের আবহ এবং মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি একসঙ্গে মিশে যায়। তাঁর কণ্ঠ ও গিটারের সমন্বয় ব্যান্ডটিকে দ্রুত শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।

‘সেই তুমি’ ও ‘রুপালি গিটার’—প্রজন্ম পেরোনো আবেগ
এলআরবির ‘সুখ’, ‘তবুও’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘ফেরারি মন’ ও ‘স্বপ্ন’ অ্যালবামের গান শ্রোতাদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। এসব গানের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে প্রেম, বিচ্ছেদ, একাকিত্ব, স্বপ্ন এবং জীবনের নানা টানাপোড়েন।

‘চলো বদলে যাই’ শুধু একটি জনপ্রিয় গান নয়, অনেক শ্রোতার কাছে এটি জীবনের প্রতি নতুন করে তাকানোর অনুপ্রেরণা। অন্যদিকে ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’ বিচ্ছেদের বেদনা ও হারানোর অনুভূতিকে এমনভাবে তুলে ধরেছে, যা অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে গেছে।

আর ‘রুপালি গিটার’ যেন আইয়ুব বাচ্চুর শিল্পীসত্তারই প্রতীক। গানটির নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গিটার হাতে তাঁর সেই পরিচিত অবয়ব। গিটারকে শুধু বাদ্যযন্ত্র হিসেবে নয়, নিজের আবেগ ও আত্মপ্রকাশের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন তিনি। তাই তাঁর গান শোনা মানে অনেকের কাছে কেবল সুর উপভোগ করা নয়, বরং ফিরে যাওয়া স্মৃতি, অনুভূতি ও জীবনের বিশেষ কিছু মুহূর্তে।

গায়ক পরিচয়ের বাইরে বহুমাত্রিক আইয়ুব বাচ্চু
আইয়ুব বাচ্চু শুধু একজন জনপ্রিয় গায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক এবং অসাধারণ গিটারবাদক। সংগীতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘রক্তগোলাপ’। পরবর্তী সময়ে ‘ময়না’, ‘কষ্ট’ ও ‘সময়’সহ একাধিক একক অ্যালবামে নিজের বহুমাত্রিক প্রতিভার পরিচয় দেন তিনি। ব্যান্ডের গান কিংবা একক সংগীত—দুই ক্ষেত্রেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন।

তাঁর গিটারবাদনের বিশেষত্ব ছিল সুরের ভেতর আবেগের গভীর প্রকাশ। রক ও ব্লুজের প্রভাব থাকলেও তাঁর বাজনায় ছিল নিজস্ব স্বাক্ষর। কখনো দ্রুতগতির গিটার রিফে তৈরি হয়েছে উত্তেজনা, কখনো দীর্ঘ সুরের টানে প্রকাশ পেয়েছে বিষণ্নতা। গিটারের মাধ্যমে শ্রোতার মনে যে আবেগ তৈরি করা যায়, আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন তার অন্যতম সফল শিল্পী। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতকে জনপ্রিয়তার নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে তাঁর অবদানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাজ পরবর্তী প্রজন্মের বহু সংগীতশিল্পীর কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।

অনুপস্থিতিতেও অনুভূতির সঙ্গী
শিল্পীর চলে যাওয়ার পর তাঁর গান কীভাবে মানুষের জীবনের অংশ হয়ে থাকে, আইয়ুব বাচ্চুর ক্ষেত্রে তা স্পষ্ট। আজও অনেকেই নিঃসঙ্গ রাতে শোনেন ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’। ‘আসলে কেউ সুখী নয়’ গানের কথায় খুঁজে পান নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি। আবার ‘সেই তুমি’ ফিরে আসে পুরোনো সম্পর্কের স্মৃতি কিংবা হারিয়ে যাওয়া কোনো সময়ের কথা মনে করিয়ে দিতে।

গানের এই স্থায়িত্বই একজন শিল্পীর প্রকৃত সার্থকতার পরিচয়। সময় বদলায়, শ্রোতাদের প্রজন্ম বদলায়, সংগীত শোনার মাধ্যমও পাল্টে যায়। কিন্তু যে গান মানুষের আবেগকে স্পর্শ করতে পারে, তা নতুন শ্রোতার কাছেও অর্থবহ হয়ে ওঠে। আইয়ুব বাচ্চুর গানও সেইভাবেই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে যাচ্ছে।

তাঁর কণ্ঠ আর নতুন কোনো গান নিয়ে মঞ্চে ফিরবে না—এ সত্য মেনে নেওয়া কঠিন। তবু তাঁর সৃষ্টি থেমে নেই। রেডিও, টেলিভিশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কিংবা ব্যক্তিগত প্লেলিস্টে তাঁর গান প্রতিনিয়ত ফিরে আসে। কোনো গান আনন্দ দেয়, কোনোটি পুরোনো স্মৃতি জাগায়, আবার কোনোটি কঠিন সময়ে নিঃশব্দ সঙ্গী হয়ে থাকে।

চট্টগ্রামে স্মৃতির প্রতীক ‘রুপালি গিটার’
জন্মশহর চট্টগ্রামে আইয়ুব বাচ্চুর স্মৃতি ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে ‘রুপালি গিটার’ ভাস্কর্য। এটি শুধু একজন সংগীতশিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন নয়; বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে তাঁর অবস্থানেরও প্রতীক। তবে তাঁর স্মৃতি কেবল কোনো ভাস্কর্য কিংবা নির্দিষ্ট স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে তাঁর গানের যে অদৃশ্য স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে উঠেছে, সেটিই তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।

আট বছর পেরিয়ে গেলেও আইয়ুব বাচ্চুকে ঘিরে আবেগের জায়গাটি ফুরিয়ে যায়নি। তাঁর গিটারের ঝংকারে এখনও কেউ খুঁজে পান সাহস, কেউ বিচ্ছেদের ভাষা, কেউবা ফিরে পান জীবনের হারিয়ে যাওয়া কোনো অধ্যায়। শিল্পী হিসেবে তাঁর শরীরী উপস্থিতি নেই, কিন্তু সুরের ভেতর তিনি আজও জীবন্ত।

হয়তো এ কারণেই ‘রুপালি গিটার’ কিংবা ‘সেই তুমি’ বাজলে মনে হয়, আইয়ুব বাচ্চু কোথাও হারিয়ে যাননি। তিনি আছেন তাঁর সৃষ্টিতে, শ্রোতাদের স্মৃতিতে এবং বাংলা ব্যান্ডসংগীতের প্রতিটি প্রজন্মের ভালোবাসায়। তাঁর গিটার থেমেছে, কিন্তু সেই গিটারের সুর থামেনি।

সন্ধানী বার্তা/জেএন/এসএ


সম্পর্কিত খবর