কৃষিকে কেবল ফসল উৎপাদনের খাত হিসেবে নয়, বরং উদ্যোক্তা সৃষ্টি, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বড় উদ্যোগের প্রস্তুতি চলছে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ‘বাংলাদেশ অ্যাগ্রি এন্টারপ্রেনারশিপ প্রজেক্ট (বিএপি)’ হাতে নেওয়ার প্রাথমিক পরিকল্পনা করছে সরকার। বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়নে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে প্রকল্পটির। তবে অর্থায়ন, ব্যয়ের কাঠামো ও কার্যক্রম এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
প্রস্তাবিত এ উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো, কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে এনে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ ও সরকারি সেবার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের নিরাপত্তা ও সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা বাড়াতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে কৃষকের উৎপাদন সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে পণ্য বিক্রি পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
- উৎপাদন থেকে উদ্যোক্তা তৈরিতে জোর
- বাজারসংযোগ ও ডিজিটাল সেবায় বড় বিনিয়োগের উদ্যোগ
উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারে নজর
বাংলাদেশের কৃষিতে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বাড়ানো, উন্নত বীজ-সার সরবরাহ ও কৃষি সম্প্রসারণ সেবার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে কৃষক ন্যায্য দাম পান না। মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব, সংরক্ষণ সুবিধার সীমাবদ্ধতা, বাজারতথ্যের ঘাটতি এবং পচনশীল পণ্যের দ্রুত বিপণনের প্রয়োজনীয়তা কৃষকের আয়ের ওপর চাপ তৈরি করে।
বিএপি প্রকল্পের প্রস্তাবিত কাঠামোতে এই ব্যবধান কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃষক, কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা এবং সংশ্লিষ্ট বাজার-অংশীজনদের মধ্যে উৎপাদনশীল অংশীদারি গড়ে তোলার মাধ্যমে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বিপণনকে একই ধারায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর অর্থ, কৃষক শুধু পণ্য উৎপাদন করেই দায়িত্ব শেষ করবেন না; বাজারের চাহিদা, ক্রেতার প্রয়োজন, পণ্যের মান এবং সরবরাহের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তারা উৎপাদকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করে কাঁচামাল সংগ্রহ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবেন।
প্রথম ধাপে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা
প্রকল্পের প্রাথমিক নকশায় চারটি প্রধান উপাদান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে উৎপাদনশীল অংশীদারি গড়ে তোলার জন্য। প্রথম উপাদান: উৎপাদনশীল অংশীদারি— ২২৫ মিলিয়ন ডলার। কৃষক, কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা ও অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে উৎপাদন এবং বাজারব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে। মোট প্রস্তাবিত প্রথম ধাপের ব্যয়ের প্রায় ৬৪ শতাংশ এ খাতে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
দ্বিতীয় উপাদান: ডিজিটাল কৃষিসেবা— ৭৫ মিলিয়ন ডলার। সরকারি কৃষিসেবায় ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণে এ অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। তৃতীয় উপাদান: খাদ্যনিরাপত্তা ও অনুসরণযোগ্যতা— ৩০ মিলিয়ন ডলার। কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত তথ্য সংরক্ষণ ও অনুসরণ করার ব্যবস্থা জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চতুর্থ উপাদান: প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় — ২০ মিলিয়ন ডলার। প্রকল্প পরিচালনা, অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে এ অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রথম ধাপে চার উপাদানের জন্য ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী দুই ধাপে যথাক্রমে ৩০০ মিলিয়ন ও ২৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। এভাবে তিন ধাপে মোট অর্থায়নের প্রস্তাব দাঁড়াচ্ছে ৯০০ মিলিয়ন ডলার।
ডিজিটাল অবকাঠামো কি বদলাতে পারবে কৃষিসেবার চিত্র?
কৃষি খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে কৃষকের কাছে আবহাওয়া, রোগবালাই, উৎপাদন পদ্ধতি, বাজারদর ও সরকারি সহায়তাসংক্রান্ত তথ্য পৌঁছানো সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি সেবা ব্যবস্থাপনায় তথ্যের সমন্বয় বাড়লে সহায়তা বিতরণ ও সেবার কার্যকারিতা মূল্যায়নের সুযোগও তৈরি হবে। কিন্তু শুধু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। কৃষকের ডিজিটাল সাক্ষরতা, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে সহায়তা এবং তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, নারী কৃষক এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে সেবার আওতায় আনা না গেলে ডিজিটাল ব্যবস্থার সুফল অসমভাবে বণ্টিত হতে পারে।
উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত নজরদারির সুযোগ
প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষিপণ্যের অনুসরণযোগ্যতা বা ট্রেসেবিলিটি। কোনো পণ্য কোথায় উৎপাদিত হয়েছে, কীভাবে সংগ্রহ ও পরিবহন করা হয়েছে এবং সরবরাহব্যবস্থার কোন কোন ধাপ অতিক্রম করেছে—এসব তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করাই এর মূল উদ্দেশ্য। এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, দূষিত বা অনিরাপদ পণ্যের উৎস শনাক্ত করা এবং রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
তিন অধিদপ্তরের সমন্বয়
প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও মৎস্য অধিদপ্তর যুক্ত থাকবে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় ডিএইকে প্রধান বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে রাখার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনটি খাতকে একই কাঠামোয় আনার ফলে কৃষি, পশুপালন ও মৎস্য উৎপাদনের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এসব খাতের উৎপাদনচক্র, বাজারব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত প্রয়োজন ভিন্ন। তাই দায়িত্ব বণ্টন, তথ্য বিনিময়, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং ফলাফল পরিমাপের সুস্পষ্ট কাঠামো প্রয়োজন হবে।
আগের কর্মসূচির অভিজ্ঞতা পরিকল্পনা
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ‘প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ কর্মসূচির অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিদ্যমান কর্মসূচির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, বাজারমুখী ও জলবায়ুসহিষ্ণু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষির স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো জরুরি। উৎপাদনঝুঁকি কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
অর্থায়ন চূড়ান্ত নয়, চলছে কারিগরি প্রস্তুতি
প্রস্তাবিত প্রকল্পের লিড ফোকাল শাখাওয়াত হোসেন শরীফ জানিয়েছেন, প্রকল্পের অর্থায়ন, ব্যয়ের খাত ও কার্যক্রম এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিশ্বব্যাংক ও সরকারের মধ্যে আলোচনা এবং সমঝোতার ভিত্তিতে প্রকল্পের আকার ও কর্মপরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে প্রকল্পের কারিগরি নোট তৈরির কাজ চলছে। এ জন্য একটি প্রস্তুতি দলও গঠন করা হয়েছে।
অর্থাৎ, প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি এখনো প্রস্তুতি ও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। প্রস্তাবিত অর্থায়নকে চূড়ান্ত অনুমোদন বা নিশ্চিতভাবে প্রাপ্ত অর্থ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চূড়ান্ত ব্যয়, অর্থ ছাড়ের সময়সূচি, বাস্তবায়নকাল এবং সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম নির্ধারিত হওয়ার পরই প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা স্পষ্ট হবে।
সন্ধানী বার্তা/টিইকে/এমকে