বিনোদন

সুন্দরবনে কুমিরের ভয়, অবশেষে ফিরছে চঞ্চল চৌধুরীর ‘ফেউ ২’

দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে দর্শকদের সামনে আসতে যাচ্ছে জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘ফেউ’র দ্বিতীয় সিজন। নির্মাতা সুকর্ণ সাহেদ ধীমান ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরেই সিরিজটির বাকি অংশ মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও মুক্তির নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে নতুন সিজন ঘিরে দর্শকদের মধ্যে আবারও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

সিরিজটির প্রথম সিজন মুক্তির পর থেকেই পরবর্তী অংশ দেখার অপেক্ষায় ছিলেন দর্শকেরা। বিশেষ করে রহস্য, ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মিশেলে নির্মিত গল্পটি যেভাবে এগিয়েছে, তাতে দ্বিতীয় সিজনে কী ঘটবে, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে। এবার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্মাতা ও প্রযোজনা সংশ্লিষ্টরা।

সুন্দরবনে শুটিং, কুমিরের ভয় আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা

‘ফেউ’ সিরিজের শুটিং করতে গিয়ে কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। সুন্দরবনের দুর্গম পরিবেশে টানা প্রায় এক মাস শুটিং হয়েছিল সিরিজটির। এর মধ্যে ২০ দিনেরও বেশি সময় শুটিংয়ে অংশ নেন চঞ্চল। রাতের তীব্র ঠান্ডা, লঞ্চে থাকা এবং চারপাশে কুমিরের উপস্থিতি মিলিয়ে শুটিংয়ের দিনগুলো তাঁর জন্য ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং।

নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে চঞ্চল চৌধুরী বলেন, শুটিংয়ের সময় প্রচণ্ড ঠান্ডা ছিল। রাতে লঞ্চে ঘুমানোর সময় শীতের পোশাক পরেও ঠান্ডা অনুভব করতেন তিনি। তবে তাঁর কাছে ঠান্ডার চেয়েও বড় ভয়ের কারণ ছিল কুমির।

অভিনেতার ভাষ্য, ‘আমরা যখন শুটিং করেছি তখন ছিল প্রচণ্ড ঠান্ডা। মাস খানেক সুন্দরবনে শুটিং হয়েছে, যার মধ্যে আমি ছিলাম ২০ দিনের বেশি। রাতে যখন লঞ্চে ঘুমাতাম, খুব ঠান্ডা লাগত। আমি শীতের জামা-কাপড় পরেই ঘুমাতাম। তবে ঠান্ডার চেয়েও ভয়ের বিষয় ছিল কুমির।’

লঞ্চের পাশেই কুমির, রাতে চলত শুটিং

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশে শুটিংয়ের সময় বন্য প্রাণীর উপস্থিতি বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন তৈরি করেছিল। চঞ্চল জানান, তাঁদের লঞ্চ যেখানে নোঙর করা ছিল, সেখানে কুমির দেখা যেত। সকালে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই কুমিরসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী ও পাখি চোখে পড়ত।

শুটিংয়ের জন্য লঞ্চ থেকে ছোট ছোট ট্রলারে করে নির্ধারিত স্থানে যেতে হতো শিল্পী ও কলাকুশলীদের। শুধু দিনের আলোতেই নয়, রাতেও শুটিং করতে হয়েছে তাঁদের। ফলে দুর্গম পরিবেশ, যাতায়াতের সীমাবদ্ধতা এবং বন্য প্রাণীর উপস্থিতির কারণে পুরো কাজটি ছিল বেশ কঠিন।

চঞ্চল চৌধুরীর বর্ণনায়, ‘আমাদের লঞ্চ যেখানে নোঙর করা ছিল, সেখানে ছিল কুমিরটা। সকালে জানালা দিয়ে মুখ বের করলেই কুমির এবং আরও বিভিন্ন পশু-পাখি দেখা যেত। আমরা লঞ্চ থেকে শুটিং স্পটে যেতাম ছোট ছোট ট্রলারে। রাতেও শুটিং করতে হতো, খুব কঠিন পরিস্থিতি ছিল।’

অভিনেতার এই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, ‘ফেউ’র গল্পকে পর্দায় বাস্তবসম্মত করে তুলতে নির্মাণসংশ্লিষ্টদের প্রকৃতির প্রতিকূল পরিবেশেও কাজ করতে হয়েছে।

ইতিহাসের ছায়ায় নির্মিত ‘ফেউ’র গল্প

‘ফেউ’ নির্মিত হয়েছে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার মরিচঝাঁপি দ্বীপে ঘটে যাওয়া গণহত্যার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ছায়া অবলম্বনে। তবে বাস্তব ইতিহাস থেকে অনুপ্রাণিত হলেও সিরিজটির গল্প কাল্পনিক।

সিরিজটির গল্প লিখেছেন সুকর্ণ সাহেদ ধীমান ও রোমেল রহমান। চিত্রনাট্য করেছেন সুকর্ণ সাহেদ ধীমান ও সিদ্দিক আহমেদ।

প্রথম সিজনে দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের সময় নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাওয়া একদল হিন্দুধর্মাবলম্বী মানুষের আশ্রয় নেওয়ার কাহিনি তুলে ধরা হয়। গল্পে ডুমুরঝাঁপি নামের একটি স্থানে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। তাঁদের উচ্ছেদ করতে খাবার ও পানির সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘরে আগুন দেওয়া, নৌকা ডুবিয়ে দেওয়া এবং নির্বিচারে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা গল্পের নির্মম বাস্তবতাকে সামনে আনে।

এই পরিস্থিতির ছবি তুলে সত্য প্রকাশের চেষ্টা করেন মোংলা চার্চের রেভারেন্ড ফটোগ্রাফার সুনীল। কিন্তু একসময় তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার রহস্যই পরবর্তী সময়ে গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

বাবার খোঁজে ড্যানিয়েল, রহস্যের কেন্দ্রে পুরোনো ছবি

প্রথম সিজনের গল্পে সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে সামনে আসে সুনীলের ছেলে ড্যানিয়েল। বাবার নিখোঁজ হওয়ার প্রায় দুই যুগ পর সুনীলের তোলা কিছু ছবির সন্ধানে নামে সে। ছবিগুলোর সূত্র ধরে ধীরে ধীরে সামনে আসতে থাকে অতীতের নানা ঘটনা ও অজানা তথ্য।

একপর্যায়ে ড্যানিয়েল জানতে পারে, যাঁকে তার বাবার কবর বলে জানানো হয়েছিল, সেখানে আসলে কবর দেওয়া হয়েছিল একটি গাছের গুঁড়ি। এই তথ্য তার অনুসন্ধানকে নতুন দিকে নিয়ে যায়। বাবার প্রকৃত পরিণতি জানতে শুরু হয় ড্যানিয়েলের যাত্রা।

সুনীল বেঁচে আছেন, নাকি বহু আগেই মারা গেছেন—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই এগিয়ে যায় গল্প। পাশাপাশি পুরোনো ছবি, ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি এবং ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রহস্য আরও গভীর হয়।

দ্বিতীয় সিজনে এই রহস্যের কী পরিণতি হবে, ড্যানিয়েল কি বাবার সন্ধান পাবে, আর অতীতের কোন কোন অজানা ঘটনা সামনে আসবে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানার অপেক্ষায় রয়েছেন দর্শকেরা।

২০২৫ সালে প্রথম সিজন, এরপর দীর্ঘ অপেক্ষা

২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে মুক্তি পেয়েছিল ‘ফেউ’র প্রথম সিজন। সে সময় জানা গিয়েছিল, সিরিজটির দুই সিজনের শুটিং একটানা সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে প্রথম সিজন মুক্তির পর দর্শকদের ধারণা ছিল, খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না পরবর্তী অংশের জন্য।

কিন্তু মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও দ্বিতীয় সিজনের মুক্তির নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। এতে দর্শকদের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়েছে। প্রথম সিজনের গল্প অসমাপ্ত থাকায় এবং সুনীলের নিখোঁজ হওয়ার রহস্যের সমাধান না আসায় পরবর্তী অংশ নিয়ে আগ্রহও বজায় রয়েছে।

এবার নির্মাতা ও চরকি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে নতুন করে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরেই সিরিজটির সম্পূর্ণ গল্প দর্শকদের সামনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

নির্মাতাও অপেক্ষায়, তবে চূড়ান্ত হয়নি মুক্তির তারিখ

দ্বিতীয় সিজনের মুক্তি নিয়ে নির্মাতা সুকর্ণ সাহেদ ধীমান জানিয়েছেন, তিনিও সিরিজটির বাকি অংশ দর্শকদের সামনে আনার অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে পুরো পরিকল্পনা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি।

নির্মাতার ভাষ্য, ‘আমি নিজেও অপেক্ষায় আছি ফেউ সিরিজের বাকি অংশের জন্য। এই বছরে আমরা ফেউ-এর সম্পূর্ণটা রিলিজ দিতে চাই। কিন্তু পুরো পরিকল্পনাটা এখনো অফিশিয়ালি কনফার্ম হয়নি। কনফার্ম হলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে।’

চরকি কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, চলতি বছরেই দ্বিতীয় সিজন মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এবং এ নিয়ে আলোচনা চলছে। শিগগিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলেও আভাস পাওয়া গেছে।

তবে পরিকল্পনা থাকলেও নির্দিষ্ট মুক্তির দিনক্ষণ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তাই দর্শকদের আপাতত অপেক্ষা করতে হচ্ছে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য।

চঞ্চল চৌধুরীর সঙ্গে অভিনয়ে আরও যাঁরা

‘ফেউ’ সিরিজে চঞ্চল চৌধুরী ছাড়াও অভিনয় করেছেন তারিক আনাম খান, মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, তাহমিনা অথৈ, তানভীর অপূর্ব, হোসেন জীবন, রিজভি রিজু ও এ কে আজাদ সেতুসহ আরও অনেকে।

শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী, ইতিহাসের ছায়ায় নির্মিত রহস্যময় গল্প এবং সুন্দরবনের দুর্গম পরিবেশে শুটিং—সব মিলিয়ে সিরিজটি দর্শকদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, দ্বিতীয় সিজনে ড্যানিয়েলের অনুসন্ধান কোন পরিণতির দিকে যায় এবং সুনীলকে ঘিরে থাকা রহস্যের কতটা সমাধান মেলে।

চরকি ও নির্মাতার পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি বছরেই ‘ফেউ’র দ্বিতীয় সিজন মুক্তি পেলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে দর্শকদের। তবে চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণার আগ পর্যন্ত মুক্তির সময়সূচি নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।

সন্ধানী বার্তা/এসএ


সম্পর্কিত খবর