প্রতি বছর ১৩ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব থ্রম্বোসিস দিবস। রক্ত জমাট বাঁধার কারণ, লক্ষণ, ঝুঁকি, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোই এ দিবসের মূল লক্ষ্য। ২০২৬ সালের প্রচারণায় নারীর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। গর্ভাবস্থা, সন্তান প্রসবের পরবর্তী সময়, ইস্ট্রোজেনযুক্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং নির্দিষ্ট হরমোন চিকিৎসার সঙ্গে এ ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে।
থ্রম্বোসিস কী, কেন বিপজ্জনক?
আঘাত পেলে রক্তপাত বন্ধ করার জন্য রক্ত জমাট বাঁধা শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু রক্তনালির ভেতরে অপ্রয়োজনে জমাট তৈরি হলে তা রক্তপ্রবাহ আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে। এ অবস্থাই থ্রম্বোসিস।
রক্তনালির ধরন অনুযায়ী থ্রম্বোসিস প্রধানত দুই ধরনের—শিরাজনিত ও ধমনিজনিত। শিরায় রক্ত জমাট বাঁধলে তাকে শিরাজনিত থ্রম্বোসিস এবং ধমনিতে জমাট বাঁধলে ধমনিজনিত থ্রম্বোসিস বলা হয়।
শিরায় তৈরি জমাটের কোনো অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে রক্তের সঙ্গে ফুসফুসের ধমনিতে পৌঁছালে ফুসফুসে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ অবস্থাকে পালমোনারি এম্বোলিজম বলা হয়, যা জীবনসংকট তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, হৃদ্যন্ত্রের ধমনি বন্ধ হয়ে গেলে হার্ট অ্যাটাক এবং মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী ধমনি বন্ধ হলে ইস্কেমিক স্ট্রোক হতে পারে।
থ্রম্বোসিসের চারটি ধরন
গভীর শিরায় রক্ত জমাট: সাধারণত পায়ের উরু, পিণ্ডলি বা শ্রোণির গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধে। কখনো হাতের গভীর শিরাতেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। আক্রান্ত অঙ্গ ফুলে যাওয়া, ব্যথা ও ত্বক গরম হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
ফুসফুসের ধমনিতে রক্ত জমাট: শিরায় তৈরি জমাটের অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে ফুসফুসের ধমনিতে পৌঁছে রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে দিলে এ অবস্থা হয়। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, মাথা ঘোরা কিংবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
ধমনিতে রক্ত জমাট: ধমনিতে রক্ত জমাট বাঁধলে সংশ্লিষ্ট অঙ্গে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি হয়। এর ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
উপরিভাগের শিরায় রক্ত জমাট: ত্বকের কাছাকাছি শিরায় জমাট ও প্রদাহ তৈরি হলে আক্রান্ত স্থানে ব্যথা, লালচে ভাব এবং শিরা শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
যেসব কারণে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ে
থ্রম্বোসিসের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। রক্তপ্রবাহ ধীর হয়ে যাওয়া, রক্তনালির ক্ষতি এবং রক্তের জমাট বাঁধার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া—এ তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়াতে পারে—
- দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা বা শুয়ে থাকা।
- বড় অস্ত্রোপচার, গুরুতর আঘাত কিংবা দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকা।
- ক্যানসার ও কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগ।
- অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা।
- ধূমপান।
- বয়স বৃদ্ধি।
- বংশগতভাবে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা।
- নিজের বা পরিবারের সদস্যদের আগে রক্ত জমাট বাঁধার ইতিহাস।
- গর্ভাবস্থা ও সন্তান প্রসবের পরবর্তী সময়।
- ইস্ট্রোজেনযুক্ত জন্মনিয়ন্ত্রণের ওষুধ ও নির্দিষ্ট হরমোন চিকিৎসা।
তবে এসব ঝুঁকির উপাদান থাকলেই যে থ্রম্বোসিস হবে, তা নয়। আবার পরিচিত কোনো ঝুঁকির কারণ না থাকলেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যে লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হতে হবে
থ্রম্বোসিসের লক্ষণ নির্ভর করে শরীরের কোথায় রক্ত জমাট বেঁধেছে তার ওপর। অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধলেও স্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে।
পা বা হাতের গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধলে সাধারণত এক পাশের পা বা হাত ফুলে যেতে পারে। আক্রান্ত স্থানে ব্যথা, চাপ দিলে অস্বস্তি, ত্বক গরম হয়ে যাওয়া কিংবা ত্বকের রং পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে, ফুসফুসের ধমনিতে রক্ত জমাট পৌঁছালে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, শ্বাস নেওয়া বা কাশির সময় বুকব্যথা বেড়ে যাওয়া, দ্রুত হৃদস্পন্দন, কাশির সঙ্গে রক্ত আসা, মাথা ঘোরা কিংবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।
হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। এসব লক্ষণকে সাধারণ শারীরিক দুর্বলতা বা সাময়িক অসুস্থতা ভেবে অবহেলা করা বিপজ্জনক।
২০২৬ সালে নারীর স্বাস্থ্য কেন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে?
নারীর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে হরমোনের পরিবর্তন এবং শারীরিক অবস্থার কারণে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থা, সন্তান প্রসবের পরবর্তী সময় এবং কিছু হরমোনভিত্তিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি: গর্ভাবস্থায় প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ থেকে শরীরকে সুরক্ষিত রাখতে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। একই সঙ্গে জরায়ুর আকার বৃদ্ধির কারণে পায়ের শিরায় রক্তপ্রবাহ ধীর হতে পারে। এসব পরিবর্তন রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ায়।
গর্ভাবস্থায় এক পাশের পা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া, নতুন করে ব্যথা কিংবা ত্বক গরম হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সন্তান প্রসবের পরবর্তী সময়: সন্তান জন্ম দেওয়ার পরও কিছু সময় নারীর রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বেশি থাকে। বিশেষ করে প্রসবের পর প্রথম ছয় সপ্তাহ ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি প্রায় তিন মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার, দীর্ঘ সময় শয্যাশায়ী থাকা, অতিরিক্ত ওজন, আগে রক্ত জমাট বাঁধার ইতিহাস কিংবা প্রসবকালীন কিছু জটিলতা থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদে চলাফেরা, প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকি মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
জন্মনিয়ন্ত্রণের ওষুধ ও হরমোন চিকিৎসা: ইস্ট্রোজেনযুক্ত কিছু জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি এবং নির্দিষ্ট হরমোন চিকিৎসা রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে সব জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ঝুঁকি এক নয়। নিজের বয়স, স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনায় চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে উপযুক্ত পদ্ধতি বেছে নেওয়া উচিত।
পুরুষ ও শিশুদেরও রয়েছে ঝুঁকি
থ্রম্বোসিস শুধু নারীদের সমস্যা নয়; পুরুষদেরও এ ঝুঁকি রয়েছে। বয়স বৃদ্ধি, ধূমপান, স্থূলতা, ক্যানসার, অস্ত্রোপচার, দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকা এবং আগে রক্ত জমাট বাঁধার ইতিহাস পুরুষদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এক পাশের পা ফুলে যাওয়া, অকারণে ব্যথা কিংবা হঠাৎ শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
শিশুদের মধ্যে থ্রম্বোসিস তুলনামূলক বিরল হলেও গুরুতর হতে পারে। নবজাতক, গুরুতর অসুস্থ শিশু, নিবিড় পরিচর্যায় থাকা রোগী, দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকা শিশু এবং শিরায় নল স্থাপন করা শিশুদের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ক্যানসার, গুরুতর সংক্রমণ এবং কিছু বংশগত সমস্যাও এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
কীভাবে থ্রম্বোসিস শনাক্ত করা হয়?
শুধু লক্ষণ দেখে থ্রম্বোসিস নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা, বয়স, চিকিৎসার ইতিহাস এবং ঝুঁকির উপাদান বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করেন।
ডি-ডাইমার পরীক্ষা: রক্ত জমাট ভাঙার প্রক্রিয়ায় তৈরি পদার্থের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে এ পরীক্ষার স্বাভাবিক ফল থ্রম্বোসিসের সম্ভাবনা কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে ডি-ডাইমারের মাত্রা বেড়ে গেলেই রক্ত জমাট বেঁধেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
আল্ট্রাসনোগ্রাফি: পায়ের গভীর শিরায় রক্ত জমাট শনাক্ত করতে শিরার রক্তপ্রবাহ পরীক্ষা বা ভেনাস আল্ট্রাসনোগ্রাফি বহুল ব্যবহৃত।
ফুসফুসের রক্তনালির বিশেষ চিত্রায়ণ: ফুসফুসের ধমনিতে রক্ত জমাটের সন্দেহ হলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ সিটি স্ক্যানসহ অন্যান্য পরীক্ষা করতে পারেন।
অন্যান্য পরীক্ষা: পরিস্থিতি অনুযায়ী হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম পরীক্ষা, হৃদ্যন্ত্রের আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও অন্যান্য রক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। সব রোগীর জন্য সব পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না; চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
থ্রম্বোসিস প্রতিরোধে যা করবেন
রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমাতে দৈনন্দিন জীবনযাপনে কিছু অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
- দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থেকে নিয়মিত বিরতিতে দাঁড়ান ও হাঁটুন।
- দীর্ঘ ভ্রমণের সময় সম্ভব হলে প্রতি এক থেকে দুই ঘণ্টা পর হাঁটুন এবং বসে থাকাকালে পায়ের পেশি নাড়াচাড়া করুন।
- চিকিৎসকের অনুমতি অনুযায়ী নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করুন এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।
- ধূমপান পরিহার করুন।
- অস্ত্রোপচার বা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপদে চলাফেরা শুরু করুন।
- ঝুঁকি বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত জমাট প্রতিরোধের ওষুধ বা বিশেষ চাপপ্রয়োগকারী মোজা ব্যবহার করুন।
- গর্ভবতী নারী ও সদ্য সন্তান প্রসব করেছেন এমন নারীরা আগে রক্ত জমাট বাঁধার ইতিহাস থাকলে চিকিৎসককে জানান।
- জন্মনিয়ন্ত্রণের ওষুধ বা হরমোন চিকিৎসা শুরুর আগে নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রক্ত জমাট প্রতিরোধ বা চিকিৎসার ওষুধ গ্রহণ করবেন না। এসব ওষুধে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি রয়েছে।
সচেতনতাই পারে ঝুঁকি কমাতে
থ্রম্বোসিস প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে জানা, বিপদের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনের সময় চিকিৎসা নেওয়া। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, সদ্য সন্তান প্রসব করেছেন এমন নারী, অস্ত্রোপচার করা রোগী এবং দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকতে হয় এমন ব্যক্তিদের বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বিশ্ব থ্রম্বোসিস দিবসের মূল বার্তাও হলো—রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা কিংবা এক পাশের অঙ্গ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।ু
সুত্রঃ ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
সন্ধানী বার্তা/এসএ