মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে নদীতে মাছ ধরার ওপর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। এ সময়ে নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও থেমে থাকবে না সংসারের খরচ। চাল-ডাল কেনা, বাজারসদাই, সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের অন্যান্য ব্যয় মেটানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বরিশালের উজিরপুর উপজেলার নদীনির্ভর জেলেরা।
গত ৭ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে সন্ধ্যা নদীসহ উজিরপুরের নদ-নদীতে সব ধরনের মাছ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। আগামী ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা চলবে। নিষেধাজ্ঞার আগে জেলেরা নৌকা তীরে তুলে রেখেছেন। কেউ জাল মেরামত করে গুছিয়ে রেখেছেন, আবার কেউ নৌকায় আলকাতরা লাগিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছেন দীর্ঘ বিরতির জন্য। তবে মাছ ধরা বন্ধ হওয়ায় আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার চিন্তাই এখন তাঁদের প্রধান উদ্বেগ।
২৫ কেজি চালে কত দিন চলবে সংসার?
উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ৩ হাজার ৬৪৩ জন। তাঁদের মধ্যে এবার সরকারি খাদ্যসহায়তার জন্য কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৩ হাজার ৪০০। প্রত্যেককে ২৫ কেজি করে ভিজিএফের চাল দেওয়ার বরাদ্দ রয়েছে। সে হিসাবে নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে ২৪৩ জন এবার এই সহায়তার তালিকার বাইরে থাকছেন।
জেলেদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন নদীতে মাছ ধরলেও অনেক প্রকৃত জেলে এখনো জেলে কার্ড পাননি। অন্যদিকে, মাছ ধরার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন—এমন ব্যক্তিদেরও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকৃত জেলেদের একটি অংশ সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
জেলে দুলাল বলেন, “নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন নদীতে মাছ ধরতে পারব না। কিন্তু সংসারের খরচ তো বন্ধ থাকবে না। মাছ ধরা আমাদের একমাত্র আয়ের পথ। এই সময় পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব, সেটাই বড় চিন্তার বিষয়।”
সহায়তা বাড়ানোর দাবি
জেলে খলিল বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে ২৫ কেজি চাল দেওয়া হয়। কিন্তু এত কম চাল দিয়ে ২২ দিন সংসার চালানো কঠিন। বাজার খরচ, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ও অন্যান্য প্রয়োজন রয়েছে। আমরা নিষেধাজ্ঞা মানতে চাই, তবে সহায়তা আরও বাড়ানো দরকার।”
জেলে নয়ন বলেন, “আমরা চাই মা ইলিশ রক্ষা হোক। নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে মাছ ধরব না। তবে এ সময়ে বিকল্প কাজের ব্যবস্থা থাকলে সংসার চালানো সহজ হতো। প্রকৃত জেলেদের সঠিক তালিকা করে সবাইকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনা দরকার।”
জেলেদের মতে, নিষেধাজ্ঞার সময় খাদ্যসহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে তাঁদের দুর্ভোগ কমবে। একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেদের শনাক্ত করে সহায়তার আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে অভিযান
উজিরপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রসেন মজুমদার জানান, মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে নদীতে মাছ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে মৎস্য বিভাগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের পাশাপাশি জেলেদের জীবন-জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। প্রকৃত জেলেদের তালিকা হালনাগাদ, যথাসময়ে খাদ্যসহায়তা বিতরণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা আরও সহজ হবে।
মা ইলিশের প্রজনন রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে প্রস্তুত উজিরপুরের জেলেরা। তবে এই ২২ দিন পরিবার নিয়ে টিকে থাকতে পর্যাপ্ত সহায়তা ও বিকল্প আয়ের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি তাঁদের।
সন্ধানী বার্তা/ডিএইচ/এমএসআইপি