পাঁচ দশকের বন্ধুত্ব এবার অর্থনীতির আরও গভীর বন্ধনে। অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘদিনের সহযোগী জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে আগামী ২৬ অক্টোবর টোকিও যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চার দিনের এ সফরে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে অনুষ্ঠেয় সফরটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম জাপান সফর। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সফরটিকে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্বাধীনতার পর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন সহযোগী। সেতু, রেলপথ, মেট্রোরেল, বন্দর ও বিমানবন্দর উন্নয়নে দেশটির দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণ দুই দেশের সম্পর্ককে দিয়েছে দৃঢ় ভিত্তি। এবার সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থানে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। ফলে টোকিওর বৈঠকগুলোতে গুরুত্ব পাবে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে কীভাবে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপ দেওয়া যায়, সেই প্রশ্ন।
- ২৬ অক্টোবর শুরু চার দিনের সফর
- জাপানি শিল্পায়ন, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে বড় প্রত্যাশা
- বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বাড়তি প্রত্যাশা
বিনিয়োগে জাপানের দিকে বাংলাদেশের নজর
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি জাপানের শীর্ষ শিল্পোদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সংগঠন কেদানরেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক। বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে জাপানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। অটোমোবাইল, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, ইলেকট্রনিকস, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ এলে দেশের উৎপাদন খাতে নতুন গতি সঞ্চারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের বিষয়ে জাপানি প্রতিষ্ঠান টয়োটার প্রস্তাবও এ ক্ষেত্রে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু গাড়ি উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না এর প্রভাব; যন্ত্রাংশ সরবরাহ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততা এবং নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হতে পারে। জাপানি প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমশক্তির সমন্বয় শিল্পায়নের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
বাণিজ্য চুক্তিতে খুলতে পারে বাজারের পথ
দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের চুক্তি কার্যকর হলে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতার পরিসর বাড়ার পাশাপাশি জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।
তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, কৃষিপণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে। জাপানের উন্নত প্রযুক্তি, মাননিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও শিল্পদক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করা গেলে রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনার পথ আরও প্রশস্ত হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
পাঁচ দশকের সহযোগিতায় উন্নয়নের ভিত
বাংলাদেশ ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর থেকে অবকাঠামো, পরিবহন, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জাপানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে দেওয়া ঋণ সহায়তার পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৩ হাজার ৬১৮ কোটি ইয়েন। একই সময়ে অনুদান সহায়তা ছিল প্রায় ৫ হাজার ১৮৪ কোটি ইয়েন এবং কারিগরি সহযোগিতা প্রায় ১ হাজার ৮১ কোটি ইয়েন। ২০২৪ সালের ওইসিডি/ডিএসির হিসাবেও বাংলাদেশে বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী ছিল জাপান।
যমুনা বহুমুখী সেতু, ঢাকার মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, যমুনা রেলওয়ে সেতু ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের অর্থায়ন রয়েছে। এসব প্রকল্প যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে এ অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম গড়ে তোলার সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীর সম্ভাবনা
জাপানে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাংলাদেশের জন্য আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, উৎপাদন ও সেবাখাতে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি সফরের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়লে বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি তরুণদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগও সম্প্রসারিত হবে।
জাপানি ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের পেশাগত দক্ষতা অর্জনের ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে এ সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা অনুযায়ী কর্মী প্রস্তুত করা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে দুই দেশের শ্রমবাজার সহযোগিতা আরও সুসংগঠিত হতে পারে।
সম্পর্কের গভীরতা বাড়বে কৌশলগত সহযোগিতায়
টোকিও সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি সম্রাট নারুহিতোর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের কর্মসূচি রয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বাইরে পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়েও দুই দেশের মতবিনিময়ের সুযোগ থাকবে। এতে পারস্পরিক আস্থা ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই সফরের তাৎপর্য বহুমুখী। জাপানি বিনিয়োগ বাড়লে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে; বাণিজ্য সহযোগিতা বিস্তৃত হলে রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা দেখা দেবে; আর দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বাড়লে উপকৃত হবেন দেশের কর্মপ্রত্যাশী তরুণেরা। পাঁচ দশকের বন্ধুত্বের ভিত্তিতে এসব খাতে বাস্তব অগ্রগতি অর্জন করা গেলে টোকিও সফর বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে আরও ফলপ্রসূ ও ভবিষ্যতমুখী করে তুলতে পারে।
সন্ধানী বার্তা/টিইকে/এমকে