আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধে ঘাঁটি বদল, সৌদিতে নিরাপত্তার ঢাল ওয়াশিংটনের

ইরান যুদ্ধের মধ্যেই বড় সামরিক ঘাঁটি থেকে বি-১ বোমারু বিমান সরিয়ে নিল যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ডে হামলার আশঙ্কা তৈরি হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় এক ডজন বি-১ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে ইরানে দ্রুত ও ধারাবাহিক বিমান হামলা চালানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হারিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে সামরিক সক্ষমতা বন্ধ হয়নি—বরং এখন প্রশ্ন, ইরানে পরবর্তী হামলার জন্য মার্কিন বোমারু বিমানগুলো কোথায় যাবে এবং কতটা ঝুঁকি নিয়ে সেগুলো ব্যবহার করা হবে।

  • বি-১ সরছে, সৌদির আকাশে
  • বাড়ছে মার্কিন ছায়া 
  • ফেয়ারফোর্ডের নিরাপত্তা-ঝুঁকিতে ইরান অভিযানের ঘাঁটি বদল
  • হুতিদের মুখোমুখি রিয়াদকে নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত ওয়াশিংটনের

হামলার আশঙ্কা, তারপরই প্রত্যাহারগত সপ্তাহে ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির আশপাশে ব্রিটিশ বোমা নিষ্ক্রিয়কারী রোবট টহল দেয়। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় ৮৫টি বাড়ির বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে পাঁচ সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি। এক ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিককেও ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘাঁটিতে হামলার কথিত ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছে তেহরান। এর কয়েক দিনের মধ্যেই বি-১গুলো প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকদের ধারণা, বিমান, ক্রু কিংবা ঘাঁটিকে ঘিরে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা-ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বলেই এমন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

হারাল দ্রুত আঘাতের সুবিধা

ফেয়ারফোর্ড ইরানের কাছাকাছি কোনো ঘাঁটি নয়। তবু ইউরোপে অবস্থান করায় এটি মার্কিন বোমারু বিমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী ঘাঁটি হিসেবে কাজ করছিল। সেখান থেকে তুলনামূলক কম সময়ে ইরানের দিকে বড় আকারের মিশন পরিচালনা করা সম্ভব ছিল।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ক্রিস্টফ বার্গসের মতে, বি-১ সরিয়ে নেওয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত বিমান হামলার সংখ্যা বাড়ানোর সক্ষমতা কমবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক হামলা চালানোর ক্ষমতা এতে শেষ হচ্ছে না। গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফেরের ভাষায়, ওয়াশিংটন ‘একটি সুবিধাজনক হামলার ঘাঁটি’ হারিয়েছে, মূল হামলা চালানোর সক্ষমতা নয়।

কেন গুরুত্বপূর্ণ বি-১?

বি-১-এর সবচেয়ে বড় শক্তি এর বিপুল প্রচলিত অস্ত্র বহনের ক্ষমতা। কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক অরুণ ডসনের মতে, একটি বি-১ প্রায় ৩৪ টন অস্ত্র বহন করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে একসঙ্গে বহু লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল অস্ত্র নিক্ষেপে তাই বিমানটি বিশেষভাবে কার্যকর।

ইরান যুদ্ধে এমন লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে থাকতে পারে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাঁটি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পসের স্থাপনা। ফেয়ারফোর্ড হারানোর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন আরও দূরবর্তী ঘাঁটি থেকে দীর্ঘপাল্লার মিশনে যেতে হতে পারে। এতে বাড়বে উড্ডয়ন সময়, ক্রুদের ক্লান্তি এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজন।

সামনে ডিয়েগো গার্সিয়া, নাকি উপসাগর?

বি-১ কোথায় যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সম্ভাব্য দুটি বিকল্প হলো ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলো। ডিয়েগো গার্সিয়া তুলনামূলক নিরাপদ এবং বড় সামরিক অভিযানের অবকাঠামো রয়েছে। কিন্তু ইরান থেকে দূরত্ব অনেক বেশি। অন্যদিকে উপসাগরীয় ঘাঁটি থেকে দ্রুত হামলা চালানো সম্ভব হলেও ইরানি পাল্টা আঘাতের ঝুঁকি সেখানে বেশি।

ফেয়ারফোর্ড এত দিন এই দুই বিকল্পের মাঝামাঝি একটি কার্যকর অবস্থান দিচ্ছিল। সেটি না থাকায় ডিয়েগো গার্সিয়ার গুরুত্ব বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সৌদিকে পাশে রাখছে ওয়াশিংটন

এদিকে, ইয়েমেনে হুতিদের ঘিরে নতুন সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরবের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেটি মেনে চলবে।

হুতিদের হামলার মুখে সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সময়ে ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি সানা পুনর্দখলের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানে সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়ার বদলে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত গোয়েন্দা তথ্য ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তার অবস্থানে রয়েছে।

ঘাঁটি বদল, কৌশল নয়

ফেয়ারফোর্ড থেকে বি-১ সরিয়ে নেওয়া তাই ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটার সরাসরি সংকেত নয়। বরং ঝুঁকিপূর্ণ একটি ঘাঁটির বদলে নিরাপদ ও কার্যকর বিকল্প খোঁজার কৌশল এটি।

তবে এই পরিবর্তনের একটি মূল্য আছে—দ্রুত হামলার সুবিধা কমবে, দীর্ঘপাল্লার মিশনের চাপ বাড়বে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইরান ও ইয়েমেন—দুই দিকেই সংঘাতের পরিধি বাড়তে থাকলে সেই চাপ আরও তীব্র হতে পারে। তথ্যসূত্র: আলজাজিরা ও আনাদোলু এজেন্সি।

সন্ধানী বার্তা/এসবি/এমকে


সম্পর্কিত খবর